দাদা – দাদী, চাচা- ফুপু, নাতি – নাতনি, ভাই – ভাতিজা নিয়ে যে একেকটা একান্নবর্তী পরিবার ছিল এদেশের শহরে, গ্রামে তা যেন আজ রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছে। এমন বিশাল বিশাল পরিবার স্বচক্ষে দেখেছি, যা ছিল আমার দাদা – দাদীর, নানা – নানীর পরিবার। সেখানে কতোই না আনন্দ আর চারিদিক মুখরিত। বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার গ্রামের প্রায় প্রতিটা বাড়ির প্রতিটা পরিবারেই ছিল হৈ হৈ, রৈ রৈ আনন্দে ভরপুর। আত্মীয়তার বন্ধন, প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক যা ছিল বাঙ্গালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। সব- ই বরাত,রোজা, ঈদ উৎসব, পূজা -পার্বণ, পহেলা বৈশাখ এর সবই সকল ধর্মের মানুষ মিলে মিশে পালন করত।
তাইতো আমরা পল্লী কবি জসীমউদ্দীন এর কবিতা -“তুমি যাবে ভাই, যাবে মোর সাথে আমাদের ছোটো গাঁয়?
… নাড়ার আগুনে পুড়ায়ে পুড়ায়ে খাব আর যত গেঁও চাষীদের ডাকিয়া নিমন্ত্রণে”
তখন মানুষ সামান্য মটরশুঁটিও নিজেদের মধ্যে বিতরণ করে খেতো। কালের আবর্তে একদিন হারিয়ে যাবে এইসব কবিতা। আহারে জীবন! কোথা থেকে আমরা আজ কোথায় এলাম। আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। প্রখ্যাত গায়িকা সাবিনা ইয়াসমিন এর কণ্ঠে সোহাগ সিনেমায় বিখ্যাত অভিনেত্রী ববিতার লিপে একটি গান – “আজ মানুষের দারে মানবতা কেঁদে মরে/ কে জ্বালাবে আলো অন্ধ নয়নে যে রয়েছে অন্ধকারে।” সত্যি, আজ আমরা অন্ধ হয়ে গেছি। অন্ধকারে আলো জ্বালানোর প্রয়োজনটুকুও আমরা বোধ করি না। এ কোন পৃথিবীতে আমরা বসবাস করছি।
জেনজির নামে এ সমাজে আজ কারা তৈরি হচ্ছে? কথায় আছে, ‘প্রচারে প্রসার।’আজকাল কার ছেলে মেয়েরা, শিক্ষার্থীরা, আজকালকার বউয়েরা এমন তো একটু হবেই- যুগে যুগে আধুনিকতার ছোঁয়ায় শিক্ষা- সংস্কৃতি, পোশাক -পরিচ্ছেদ, শিল্প- সাহিত্যে পরিবর্তন তো আসবেই। কিন্তু অপসংস্কৃতি আর কুশিক্ষা নয়। নেপোলিয়ন যেমন বলেছিলেন, “একজন শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিব।’ তেমনি বলা যেতে পারে, তোমরা আমাকে একজন শিক্ষক দাও আমি তোমাদের একটি সমাজ উপহার দিব।
ময়মনসিংহের মুসলিম গার্লস হাইস্কুলের অংকের শিক্ষক কেসি আপা (আপার পূর্ণ নাম জানা নেই) অসম্ভব কড়া, আমরা ভয় পেতাম। তবে এটাও বুঝতে পারতাম যে আপার এই কাঠিন্যের আড়ালে কোমলতাও ছিল, আমাদের ভালোও বাসতেন। আমার মতো দুই একজন ছাড়া এই বিদ্যালয় থেকে একেকটা রত্ন তৈরি হয়েছে। যাই হোক। এখনো সময় আছে সমাজটাকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়ার। কোনো দুর্ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পরিণত করে সমালোচনার ঝড় না তুলে, কীভাবে তা নির্মুল করা যায় সেইটা ভাবা প্রয়োজন। মাত্র একুশ বছরের আয়ু নিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সমাজের জন্য অবদান রেখে গেছেন।
আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ কর্তব্যটুকু যথাযথ পালন করি এতেও সমাজের প্রতি অবদান থেকে যায়। সাম্প্রতিক যে দুইটি হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছে তা এতোটাই পরিতাপের বিষয়, যেখানে ভাষা স্থবির। পর পর ঘটনা দুটি ঘটেছে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে। আট বছরের কন্যা শিশুর প্রতি পাশবিক নির্যাতনের পর মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে নূর জাহান বেগম নামের পঁচাত্তর বছর বয়সের নারীর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। আহারে জীবন! আহারে মা! এই মুহূর্তে বিশিষ্ট লেখক আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে গেল। ছেলে আজাদ এর মৃত্যুর মা সাফিয়া বেগম চৌদ্দ বছর বেঁচে ছিলেন। এই চৌদ্দ বছর মা ভাত স্পর্শ করেননি, বিছানায় ঘুমাতে পারেননি। জসীমউদ্দীন এর ‘পল্লী জননী’ কবিতায় একজন মায়ের আকুতি গভীর মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে। নিবু নিবু প্রদীপের সাথে পল্লী মাতা ছেলের আয়ুর কথার কথা ভেবে ভয়ে দরগায় মানত করেন। মাকে নিয়ে কত গান রচিত হয়েছে-‘আম্মাজান আম্মাজান আপনি বড়ই মেহেরবান জন্ম দিছেন আমায় আপনার দুগ্ধ করছি পান।’ মাকে নিয়ে আরেকটি গান ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোশ বানাইলেও সে ঋণ শোধ হবে না”।
এইসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে চারিদিকে আলোচনার ঝড় উঠেছে। কেউ বলছেন কন্যা শিশুকে চোখে চোখে চোখে রাখতে হবে, মা – বাবার জন্য বেশি বেশি বৃদ্ধাশ্রম তৈরির কথাও উঠছে। আমরা তন্ময় হয়ে নচিকেতার গান শুনি “ছেলে আমার মস্তবড় মস্ত অফিসার।” বেগম রোকেয়া, বেগম সুফিয়া কামাল, নূরজাহান (বেগম পত্রিকার সম্পাদিকা) বেগম এর মত মহীয়সী নারীরা পর্দাপ্রথা ভেদ করে সমাজকে যেভাবে সামনে নিয়ে যেতে পেরেছেন এখন কেন সম্ভব নয়। এই প্রশ্নটি কাকে করব। ঘুরেফিরে আমরাই তো। এমন একটা সমাজ তৈরি হোক, যেখানে মধ্যরাতে নারী নির্বিঘ্নে চলতে পারে। এমন একেকটা পরিবারে আমরা ফিরে যাই, যেখানে মা- বাবাকে নির্জন ঘরে মৃত্যুবরণ করতে না হয় । আবার আমরা হয়ে যাই “সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইএর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







