পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটেস্পষ্ট ব্যবধানে জয়লাভ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), তৃণমূল কংগ্রেসের তথাকথিত ‘দুর্গ’ ভেঙে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করেনি। দীর্ঘদিনের ক্ষমতা-বিরোধী মনোভাব, আর্থিক দুর্নীতির ধারাবাহিক অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)সহ নানা কারণে ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বিজেপির অগ্রযাত্রা কঠিন বলে ভোটের আগে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করলেও, বাস্তবে দেখা গেছে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতেও বিজেপি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কেন এই পরিবর্তন?
ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যম বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করেছে। ওইসব প্রতিবেদন থেকে বিভিন্ন আলোচিত কারণ একসঙ্গে তুলে ধরা হলো।
প্রথম কারণ,
একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই স্থিতাবস্থা-বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। স্থানীয় স্তরে সিন্ডিকেটের দাপট, নেতাদের প্রভাব বিস্তার, সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি এবং সরকারি সুবিধা বণ্টনে অসাম্যসহ নানা অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। ২০২১ সালেও এই অসন্তোষ ছিল, কিন্তু সেসময় তা ভোটে নির্ণায়ক হয়ে ওঠেনি। জয়ের পর সংশোধনের সুযোগ থাকলেও, বিরোধী মনোভাব প্রশমিত হয়নি বরং গত পাঁচ বছরে তা আরও বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
দ্বিতীয় কারণ,
দুর্নীতির ইস্যু। চিটফান্ড ও নারদকাণ্ডের পর নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, কয়লা ও গরু পাচারসহ একাধিক অভিযোগে দলের শীর্ষ ও মাঝারি স্তরের নেতাদের গ্রেফতারি জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে বিপুল অর্থ উদ্ধার এবং পরবর্তী গ্রেফতারি তৃণমূল সরকারের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়। যদিও আগের নির্বাচনে এসব ইস্যু ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেনি, এবারে তা জমাট অসন্তোষের অংশ হয়ে ওঠে।
তৃতীয় কারণ,
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। বহু বছর ধরে ভুয়ো বা মৃত ভোটারের নাম তালিকায় থেকে যাওয়ার অভিযোগ ছিল। সংশোধন প্রক্রিয়ায় বহু নাম বাদ পড়ায় শাসকদলের (তৃণমূল) ‘ম্যানেজমেন্ট’ সুবিধা কমে যায় বলে বিরোধীদের দাবি। পাশাপাশি নথি-সংক্রান্ত সমস্যায় সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশের নাম বাদ পড়ার অভিযোগও ওঠে, যা রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

চতুর্থ কারণ,
সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক তোষণের অভিযোগ তুলেছে। সাম্প্রদায়িক হিংসার কয়েকটি ঘটনা এবং প্রতিবেশী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবরকে সামনে এনে বিজেপি প্রচার জোরদার করে। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু ভোটের একাংশে এই প্রচার প্রভাব ফেলেছে বলে ফলাফল ইঙ্গিত দেয়।
পঞ্চম কারণ,
প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন। এসআইআর পর্ব থেকেই নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তা এবং আদালতের হস্তক্ষেপে রাজ্য প্রশাসনে পরিবর্তন আসে। ভোট ঘোষণার পর উচ্চপদস্থ আমলা থেকে থানা স্তর পর্যন্ত রদবদল পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। এর ফলে শাসকদলের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

ষষ্ঠ কারণ,
‘সন্ত্রাস’ বিহীন নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ। বিপুল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ও নিয়মিত টহল ভোটের আবহে পরিবর্তন আনে। অতীতে শাসকদলের (তৃণমূল) বিরুদ্ধে বিরোধীদের ভয় দেখানো বা বুথ দখলের অভিযোগ ছিল। এবার তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতে ভোট হওয়ায় বিরোধী ভোটারদের উপস্থিতি বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বহু দফার পরিবর্তে সীমিত দফায় ভোট হলেও উল্লেখযোগ্য হিংসার ঘটনা ঘটেনি। ভোটদানের হার রেকর্ড ছুঁয়েছে। ছাপ্পা বা বুথ জ্যামের অভিযোগ তুলনামূলক কম ছিল। এতে বিরোধীদের ভোট একত্রিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সপ্তম কারণ,
আই-প্যাক বিতর্ক। তৃণমূলের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আই-প্যাক হঠাৎ কাজ বন্ধের ঘোষণা দেয়। ইডির অভিযানের পর সংস্থার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সামাজিক মাধ্যম যেহেতু বর্তমান সময়ে বড় ভূমিকা রাখে, তাই আই-প্যাকের এ বিচ্ছিন্নতা বেশ প্রভাব ফেলেছে। সংগঠনের উপর অতিনির্ভরশীলতা এবং আচমকা বিচ্ছিন্নতা দলের সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে তৃণমূলের অন্দরেই মত রয়েছে।
সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের দীর্ঘ ক্ষমতার অবসান কেবল একটি ইস্যুর ফল নয়। দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ, প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রচারের প্রভাব এবং সংগঠনগত দুর্বলতা সব মিলিয়েই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি চিরন্তন প্রবণতা: দীর্ঘ সময় একই শক্তি ক্ষমতায় থাকলে ভোটারদের একাংশ স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং নতুন শক্তিকে সুযোগ দিতে আগ্রহী হয়।
(তথ্য বিশ্লেষণে এআই প্রযুক্তির ‘নোটবুক এলএম’ ও ইনফোগ্রাফ তৈরিতে ‘চ্যাটজিপিটি’ ব্যবহার করা হয়েছে)








