ছেলেবেলায় পড়েছিলাম ‘অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী’। কিন্তু এখন দেখছি বেশি বিদ্যাও কম ভয়ঙ্করী নয়। হাদিসে আছে—কেউ যদি না জেনে পাপ করে এবং প্রায়শ্চিত্ত করে, তবে তার জন্য ক্ষমা আছে; কিন্তু যে ব্যক্তি জেনে অপরাধ করে, তার জন্য আছে সাজা। এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি বলি, তবে বলতে হয়—অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষ যদি ভাষার ভুল ব্যবহার করে তবে তা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষক, সাংবাদিক, নাট্যকার, অভিনেতা অথবা বুদ্ধিজীবী খেতাবধারী লোকেরা যদি ভাষার ভুল এবং অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ করেন, তবে…।
ভদ্র ভাষায় বললে তীব্র প্রতিবাদ জানাতে ইচ্ছে হয়, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ইচ্ছে হয়, কঠোর সমালোচনা করতে ইচ্ছে হয়, রূঢ়ভাবে নিন্দা জানাতে ইচ্ছে হয়। আর প্রপ্রু (প্রফুল্ল) খালেদ চৌধুরীর ভাষায় যদি বলি, তাহলে ‘পেটাতে ইচ্ছে হয়’। কারণ এটাই সংশোধনের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।
স্কুল শিক্ষকরা পড়িয়েছিলেন, প্রায়োগিক দিক থেকে বাংলা ভাষা তিন প্রকার—সাধু, চলিত ও আঞ্চলিক। স্কুল থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অবধি প্রশ্নপত্রে লেখা থাকত—‘সাধু অথবা চলিত ভাষায় উত্তর লিখতে হবে। তবে সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ দূষণীয়।’ যাকে বলে ‘গুরুচণ্ডালী দোষ’। কিন্তু বাংলা ভাষা গুরুচণ্ডালী দূষণ পেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। এখন শুধু সাধু-চলিতই নয়, আরও অনেক কিছু মিলে এক নতুন উপাদানে পরিণত হয়েছে; যার ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা তৈরি করার জন্য আজ নেই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অথবা নরেন বিশ্বাস।
বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে তিরিশের দশক, চল্লিশের দশকের মতো ‘শূন্য দশক’ নামে একটি নতুন নামের আবির্ভাব হলো। তারা পূর্ববর্তীদের মতো ভাষা নিয়ে খেলা না করে ভাষার চরিত্র নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করল। এই খেলার শুরুটা হলো নামকরণে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেনের মতো অনেকেই পরিচিত বা বিখ্যাত হওয়ার জন্য নিজেদের নামকরণ করতে শুরু করলেন, কিন্তু তারা লিখতেন ছদ্মনামে। আর এরা পরিচিতি পাওয়ার জন্য প্রকৃত নামই বদলে ফেললেন! এমনসব নাম তারা ধারণ করতে শুরু করলেন, যেগুলো সাধারণ মানুষের বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। যেমন—নির্লিপ্ত নয়ন, যুবক অনার্য, যুবতী দ্রাবিড়; কেউবা নামের আগে-পিছে আলফ্রেড অথবা হেনরি জাতীয় পাশ্চাত্য নামের অংশ জুড়ে দিতে শুরু করল।
অবশ্য ভাষার ওপর অস্ত্রোপচারের শুরুটা আরও আগে থেকেই। বাংলাদেশ যখন পূর্ব পাকিস্তান ছিল, তখন বাংলা ভাষাকে ইসলামীকরণের চেষ্টা চালিয়েছিল তৎকালীন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সেই সময়ের বোদ্ধারা—তা-ও আবার বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে।
এরপর দেশ স্বাধীন হলে বাংলা একাডেমি বাংলা অভিধান প্রণয়ন করে বাংলা ভাষা সংরক্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে বাধা সাধলেন এ দেশের সংবাদপত্রের বিদগ্ধ সম্পাদকরা। তারা প্রত্যেকেই নিজস্ব বানানরীতি প্রচলন করলেন। বদলে যাওয়া কেউ কেউ আবার আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন; তারা নিজস্ব অভিধানই সংকলন করে বসলেন। এসব দেখেই একালের সাহিত্যিকরা অনার্য, শাখামৃগ, চঞ্চু, উরু, পশ্চাৎদেশ, কবন্ধ—ইত্যাদি নাম ধারণ করতে শুরু করলেন।
এই ধারাকে এগিয়ে দিতে পৃষ্ঠপোষকতা করল বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। দেশীয় সংস্কৃতিকে ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করতে গ্রামীণফোন তাদের ‘ডিজুস’-এর মাধ্যমে ‘আজাইরা প্যাঁচাল’, ‘ধুমাইয়া আড্ডা’, ‘কাউ কাউ কাউ’, ‘ক্যাট ক্যাট ক্যাট’, ‘খাইছি তোরে’, ‘যাবি কই’—জাতীয় সব নোংরা সংস্কৃতি উসকে দিল। ধারা ব্যাহত না রাখতে দিল অর্থের জোগান। সেই জোগানের ভাগ পেতে দেশীয় কিছু পতিত লেখক, পরিচালক এবং বদলে যাওয়া কিছু সাংবাদিক ও সংবাদপত্র হুমড়ি খেয়ে পড়ল। প্রমিত বাংলার বারোটা বাজাতে তারা তাদের জ্ঞান-মেধা উজাড় করে দিয়ে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, পত্রিকায় কলাম, নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করলেন। অবশ্য ডিজুস ব্যবহারকারী ও পৃষ্ঠপোষকদের কাছে তারা বেশ সমাদৃত হলেন এবং পোষা সারমেয় শাবকের (কুকুরছানা) মতো গদগদ হয়ে লেজ নাড়তে শুরু করলেন।
এই ধারাকে আরও এগিয়ে নিতে দেশে এলো এফএম রেডিও। তারা বেনিয়া ও পতিত লেখকদের সৃষ্ট ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করে বিরতিহীনভাবে প্রচার করতে শুরু করল। যেখানে তারা স-ছ, ড়-ঢ়-র, ব-ভ, গ-ঘ, ত-থ, প-ফ, ড-ঢ ইত্যাদি বর্ণের ব্যবহারের ভিন্নতা ঘুচিয়ে সমান্তরাল শব্দ তৈরি ও সর্বপ্রকার ব্যবহার শুরু করল। যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল প্রমিত বাংলা, আঞ্চলিক বাংলা, নব্য ডিজুস বাংলা আর ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি। এদের সুনিপুণ চেষ্টায় ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা’ ভাগাড়ে পরিণত হলো।
এরপর এই ধারা অব্যাহত রেখে তৈরি করা ভাগাড়কে দুর্গন্ধময় করতে শুরু করল একশ্রেণীর ব্লগার। যাদের কাছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে—রুচিহীন, অর্থহীন শব্দের সন্নিবেশ ঘটিয়ে অশ্লীল বাক্য রচনা করা।
দালাল, বেনিয়া আর পতিত বোদ্ধাদের কারণে বাংলা ভাষার আজ ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। কিন্তু এই ভাষা রক্ষার দায়িত্ব যাদের কাঁধে অর্পিত (বাংলা একাডেমি), তারা বসে তামাশা দেখছেন আর মাস গেলে মোটা অঙ্কের মাইনে পকেটে পুরে বাড়ি ফিরছেন। অর্থাৎ, একদল শিক্ষিত লোক ভাষার বারোটা বাজাচ্ছেন, আর একদল শিক্ষিত লোক সেটা দেখে বগল বাজাচ্ছেন। সংক্ষেপে—অল্পবিদ্যার পরিবর্তে ‘বেশি বিদ্যা ভয়ঙ্করী’ অবস্থায় এখন বাংলা ভাষা।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








