আন্তর্জাতিক

ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আঘাত

ইরানি ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের পাল্টা আঘাত

ছবি: সংগৃহীত

ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওমান উপসাগর ও খার্গ দ্বীপের কাছে এসব হামলা চালানো হয়। এর আগে ইরান দুই দিনে দুবার মার্কিন একটি যুদ্ধজাহাজে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ করে ওয়াশিংটন।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর এসব হামলার জবাবে জর্ডানে অবস্থিত আল আজরাক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে আরও দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে তেহরান। এসব হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।

উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এর মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ কার্যকর করছে। সংঘাতের প্রভাবে বুধবারের শুরুর লেনদেনে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৯ ডলারে পৌঁছায়।

মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, গত দুই দিনে ইরানের আইআরজিসি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে দুবার লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করেছে। তবে জাহাজটি সফলভাবে ওই হামলা এড়িয়ে যায়। এতে কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি বলেও জানানো হয়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র ওমান উপসাগরে থাকা ইরানের তেলবাহী ট্যাংকার এম/টি কাভিজ, এম/টি চারমিনার, এম/টি হরাইজন-১ এবং এম/টি রিয়েস্কোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করে বলে সেন্টকম জানায়। খার্গ দ্বীপের কাছে এম/টি দেরিয়াতেও হামলা চালানো হয়।

সেন্টকম জানায়, হামলার আগে জাহাজগুলোর ক্রুদের জাহাজ ছেড়ে যেতে বলা হয়েছিল। এরপর জাহাজগুলোতে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেওয়া হয়। পরে এম/টি রিয়েস্কো ডুবে যাওয়ার একটি ভিডিও প্রকাশ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি খার্গ দ্বীপের কাছে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই এলাকা দিয়ে পরিচালিত হতো। হামলার পর জাহাজের ক্রুদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে ওমান উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক বন্দরের কাছে আরও একটি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

পরে আইআরজিসি জানায়, মোট পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

পাল্টা হামলা হিসেবে জর্ডানের আল আজরাক ঘাঁটিতে ‘তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র হামলা’ চালানোর দাবি করেছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান রাখার কয়েকটি হ্যাঙ্গার ধ্বংস হয়েছে।

এ ছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর ডিডিজি-১১৯ ও ডিডিজি-৫৩ ডেস্ট্রয়ারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিও করেছে ইরান। হামলায় জাহাজ দুটিতে ‘গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে বলে জানানো হয়।

পরবর্তী এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করে, তাদের নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে এবং এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে আগে উল্লেখ করা দুটি ডেস্ট্রয়ারই ওই ‘দুটি মার্কিন জাহাজ’ কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ইরানের এসব দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র।

এর আগে বাহরাইন ও কুয়েতের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় তেলবাহী ট্যাংকারে শিগগিরই হামলা চালানো হবে বলে সতর্ক করেছিল আইআরজিসি। ট্যাংকারগুলোর সব ক্রুকে দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে। এর মধ্যে ১৮টি সফলভাবে ভূপাতিত ও ধ্বংস করা হয়েছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ধ্বংসাবশেষ ও ক্ষেপণাস্ত্রের টুকরো যেখানে পড়েছে, সেসব স্থান নিরাপদ করতে বিশেষ দল কাজ শুরু করেছে।

এর আগে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদোল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইরানের তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানো হলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা করবে তেহরান।

এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ওই হামলায় একটি ট্যাংকার ডুবে যায়। একই দিন ইরান তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই পরে জানান, হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছে তেহরান। তিনি বলেন, ওই নতুন এলাকায় প্রবেশ করা যেকোনো জাহাজকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হবে।

মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। তারা এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অবৈধ ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ দেশটির বিরুদ্ধে চলমান সামরিক আগ্রাসন ও অর্থনৈতিক যুদ্ধেরই অংশ। এর পরিণতির জন্য ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে বলেও সতর্ক করেছে তেহরান।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটবে না। রুবিও বলেন, ‘ইরান মার্কিন নৌযানগুলোতে হামলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা যতবার এমন করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবারই তাদের ট্যাংকার হারাতে হবে।’

ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হানা বলেন, হামলার মাধ্যমে ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

তার মতে, ইরানের হামলার জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন নতুন ও ভিন্ন ধরনের লক্ষ্যবস্তু বেছে নিচ্ছে। এসব হামলা পরিকল্পিত কৌশলের অংশ কি না, নাকি পরিস্থিতির কারণে নেওয়া পদক্ষেপ, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কৌশলের সঙ্গে এর মিল রয়েছে।

মঙ্গলবার আইআরজিসি আরও দাবি করে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি মানববিহীন মার্কিন সাবমেরিন জব্দ করেছে তারা। এটিকে ‘জটিল গোয়েন্দা ও সামরিক অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে ইরান।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, আঞ্চলিক জলসীমায় নজরদারি চালানোর সময় পানির নিচের ওই ড্রোনটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। তাদের দাবি, ত্রুটিপূর্ণ ড্রোনটি কোনো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করেনি এবং এতে কোনো শ্রেণিবদ্ধ সোনার বা রাডার সরঞ্জামও ছিল না।

বিষয়:ইরান জর্ডান তেলবাহী ট্যাংকার মার্কিন ঘাটি যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…