আন্তর্জাতিক

হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকিতে ৩ লাখ মানুষ

হিমালয় অঞ্চলে দুর্যোগের ঝুঁকিতে ৩ লাখ মানুষ

ছবি: সংগৃহীত

হিমালয় অঞ্চলে দ্রুতগতিতে বাড়ছে আবাসন, পর্যটনকেন্দ্র, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ। এতে নেপালের উত্তরাঞ্চল, তিব্বতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা এবং ভারতের উত্তরাখণ্ডের একটি অংশে অন্তত ৩ লাখ মানুষ সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মিত স্থাপনার পরিমাণ প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। হিমবাহের গলিত পানিতে সৃষ্ট হ্রদ থেকে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে—এমন এলাকায় নির্মাণ বেড়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

গবেষণাটি সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য, নেপাল ও ভারতের নয়জন গবেষক এ গবেষণায় অংশ নেন। তারা হিমালয়ের নদীগুলোর ভাটির দিকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা এবং প্রায় ১ হাজার ৩৬০টি হিমবাহের হ্রদের আশপাশে নির্মাণকাজের বিস্তার বিশ্লেষণ করেন। গবেষকদের মতে, প্রতিবেশী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো এই গবেষণার আওতায় না থাকায় প্রকৃত ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

গবেষণাটি গত আগস্টে নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজারো মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার আগে পরিচালিত হয়েছিল। এর পরও দেশটিতে একাধিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। গত ১১ অক্টোবর বুধি গণ্ডকী নদীতে বন্যায় প্রায় ২০০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পাঁচটি সেতু ভেসে যায় এবং পাঁচজন নিখোঁজ হন।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত নেপালের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র পোখরায় গত কয়েক দশকে ব্যাপক নির্মাণকাজ হয়েছে। শহরটির মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া সেটি গণ্ডকী নদীর তীরবর্তী অনেক পুরোনো ভবন নদী থেকে মাত্র পাঁচ মিটার দূরে অবস্থিত বলে জানিয়েছেন শহরটির মেয়র ধনা রাজ আচার্য। নতুন নিয়মে নদী থেকে আরও দূরে ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও পুরোনো স্থাপনাগুলো সরিয়ে নেওয়া কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্বখ্যাত অন্নপূর্ণা ট্রেকিং এলাকাতেও নদীর তীরে বসতি ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট স্থাপনা বেড়েছে। সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসে এসব এলাকার কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় হোটেল ও হোমস্টে ব্যবসায়ীরাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

পোখরা হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লক্ষ্মণ সুবেদী স্বীকার করেছেন, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই অঞ্চলে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটেছে। তার মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার পর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ অনেক কমে যায়। তাই পর্যটন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা চলছে।

শুধু পর্যটন নয়, ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীসংলগ্ন এলাকাতেও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বেড়েছে। নদী উপত্যকায় জনবসতি ও অবকাঠামো বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব লিডসের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ সি স্কট ওয়াটসন।

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ হারে তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে হিমবাহ, বরফক্ষেত্র, তুষারস্তর ও সারা বছর বরফে জমে থাকা মাটি দ্রুত গলছে। এর ফলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি হিমবাহের পানি জমে হ্রদের আয়তন বাড়ছে; একপর্যায়ে এসব হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। নেপালে ১৯৪০ সাল থেকে এ ধরনের প্রায় ৩০টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উঁচু পাহাড়ি এলাকায় আগে যেখানে তুষারপাত হতো, সেখানে এখন বৃষ্টিপাতও হচ্ছে। এতে পাহাড়ধস, পাথর ও বরফখণ্ড ধসসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়ছে।

গবেষণায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে নদী বা হিমবাহের হ্রদের পানির পৃষ্ঠ থেকে উল্লম্বভাবে ৫০ মিটারের মধ্যে থাকা ভবনগুলোকে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় নেপালের রাসুয়া জেলায় কোনো কোনো স্থানে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৭০ মিটার বেড়েছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। ফলে নদীর তীর থেকে তুলনামূলক দূরে থাকা স্থাপনাও কাদা, পলি ও ধ্বংসাবশেষে চাপা পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর তীরবর্তী নিচু ও সমতল জমিতে সড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, হোটেল ও বাজার গড়ে উঠছে। এসব জমি সহজে ব্যবহার করা যায় বলে নির্মাণের জন্য আকর্ষণীয় হলেও নদী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার মতো বিধিনিষেধ অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না।

নেপালের নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সূর্য রাজ আচার্যের মতে, হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর পরিবেশে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আরও কঠোর পরিকল্পনা ও নির্মাণবিধি প্রয়োজন। কিন্তু এসব নিয়ম দুর্বল এবং যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

এদিকে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া-বোতেকোশি করিডরে নদীর তীর থেকে ১৫ মিটারের মধ্যে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্য নদী উপত্যকাগুলোতেও একই ধরনের বিধিনিষেধ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বতভূগোলবিদ অ্যালটন বায়ার্সের মতে, এ গবেষণাকে আরও কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া সাম্প্রতিক ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি তুলে ধরে বলেছেন, যে সংকটের জন্য তার দেশ দায়ী নয়, তার জন্য নেপালকে বিপুল মূল্য দিতে হচ্ছে। বড় ধরনের প্রতিটি দুর্যোগ দেশটির উন্নয়নের বহু বছরের অগ্রগতিকে মুছে দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারে ঋণ নিতে বাধ্য করছে।

বিষয়:অবকাঠামো নির্মাণ ঝুঁকি নির্মিত স্থাপনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চল

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…