যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আলোচনা চলছে না এবং ভবিষ্যতেও কোনো আলোচনা নির্ধারিত নেই। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ অগাস্ট) সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য জানায়।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ‘পুরোদমে কার্যকর’ থাকলেও অন্যান্য সব ধরনের সামুদ্রিক যান চলাচল করতে পারছে। একই পোস্টে তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো একটি মানচিত্রও প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য তার অবস্থান পরিবর্তনের সর্বশেষ উদাহরণ। এর এক দিন আগে সোমবার তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে গোপন চ্যানেলে আলোচনা করছে। তবে তেহরান দ্রুতই ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
মঙ্গলবারের বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের চলমান আলোচনায় ট্রাম্প অসন্তুষ্ট। হরমুজ প্রণালির দুই তীরের দেশ ইরান ও ওমান প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ইরানকে আত্মসমর্পণের দাবি জানিয়ে আসছেন এবং ওমান এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলে দেশটিতে হামলার হুমকিও দিয়েছেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, ‘ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কথাবার্তা চলছে না এবং এমন কোনো আলোচনা নির্ধারিতও নেই। নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। হরমুজ প্রণালি খোলা ও সচল আছে। সব নৌমাইন অপসারণ করা হয়েছে অথবা বিস্ফোরিত করা হয়েছে।’
তবে ইরান আবারও জানিয়েছে, ওয়াশিংটন তাদের শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। মার্চে শুরু হওয়া সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে জুনে দুই পক্ষ যে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছিল, সেই চুক্তির শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি ট্রাম্পের পোস্টের জবাব দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘ট্রাম্প যেমন চিরন্তন পারস্য উপসাগরের নাম সঠিকভাবে লিখেছেন, তেমনি হরমুজ প্রণালি নিয়ে তার বিভ্রান্তিও শিগগির সংশোধন হবে—অথবা আমরা এই বিভ্রান্ত ব্যক্তির বিভ্রান্তি সংশোধন করব।’
এদিকে মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাতার মঙ্গলবার জানিয়েছে, ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রত্যাশিত চুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা। এরপর তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানকে পুনরায় আলোচনায় বসানোর উদ্যোগ নেবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে ‘ইতিবাচক আলোচনা’ চলছিল। তবে ট্রাম্প এখন ‘অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত’ নিয়েছেন এবং তেহরান কোনো চুক্তিতে যেতে ‘প্রস্তুত’ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনাকারী দলকে অপেক্ষা করতে বলেছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানে কোনো ‘বিরোধ’ নেই।
ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে তিনি তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে হরমুজ প্রণালির একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। মানচিত্রটির ওপর লেখা ছিল ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’। গত সপ্তাহে ইরান ‘আত্মসমর্পণ’ না করলে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, সেটিই এতে পুনরায় তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমওইউর শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।
পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে গালিবাফ বলেন, শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, তেহরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং সব ধরনের হুমকি ও সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট হচ্ছে, শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং হরমুজ দিয়ে আবারও স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু করার ক্ষেত্রে আপাতত কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে উৎক্ষেপিত দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে। পরে জানানো হয়, দুটি ক্ষেপণাস্ত্রই সাগরে গিয়ে পড়েছে।
মন্ত্রণালয় এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’।
এর আগে মঙ্গলবার সিরিয়ার পূর্ব ইদলিবের গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর সামরিক ঘাঁটিতে আটটি বিমান হামলা চালানো হয়। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় ঘাঁটিটির ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ এসব হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত টম বারাক হামলাটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কোনো ভূমিকা রাখছে না।










