রাস্টন, লুইজিয়ানা: দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, আমেরিকার লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটির সবুজ চত্বরটি যেন ক্ষণিকের জন্য হয়ে উঠেছিল এক টুকরো বাংলাদেশ। বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ বরণ করে নিতে এখানকার বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা মেতে উঠেছিলেন এক প্রাণের উৎসবে। প্রবাসের মাটিতে থেকেও শেকড়ের প্রতি ভালোবাসার এ এক অনন্য নজির।
লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটিতে বর্তমানে প্রায় ৫৫ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী পিএইচডি, মাস্টার্স এবং অনার্স পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। তাদের সাথে আছেন ৪ জন বাংলাদেশী শিক্ষকও। দেশের মাটি, প্রিয়জন ছেড়ে দূর প্রবাসে শিক্ষা অর্জন করতে এলেও তাদের মন জুড়ে থাকে বাংলাদেশ আর তার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ-লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটি-এর উদ্যোগে আয়োজিত হয় এই বর্ণাঢ্য বৈশাখী উদযাপন। এই সংগঠনটি বরাবরই প্রবাসে দেশের প্রতিটি বিশেষ দিনকে পরম মমতায় পালন করে থাকে, যা এখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে তৈরি করে এক উষ্ণ বন্ধন। তবে এবারের নববর্ষের আয়োজন ছিল সত্যিই চোখে পড়ার মতো।
সকাল থেকেই ভাজা ইলিশের গন্ধ আর পান্তা ভাতের আয়োজন মনে করিয়ে দিচ্ছিল গ্রাম বাংলার চিরায়ত বৈশাখের কথা। তার সাথে ছিল আলু, বেগুন, শুঁটকি, ডাল, মাছ থেকে শুরু প্রায় ৩০ পদের ভর্তা! এছাড়াও ছিল নানান দেশীয় পিঠা আর ঐতিহ্যবাহী সব খাবার। প্রতিটি পদেই যেন মিশে ছিল দেশের স্বাদ, মায়ের হাতের রান্নার স্মৃতি। প্রবাসীদের জন্য এ যেন ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত, যা ক্ষণিকের জন্য হলেও ভুলিয়ে দিয়েছিল বাড়ির জন্য মন খারাপের অনুভূতি।
শুধুমাত্র ভোজনবিলাসেই শেষ হয়নি এই উদযাপন। আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রবাসী শিক্ষার্থীরাই পরিবেশন করেন দেশের গান, এবং নাচ । তাদের কণ্ঠে যখন বেজে ওঠে বৈশাখের আগমনী গান বা দেশের মাটির গান, তখন উপস্থিত সকলের চোখেই যেন ভেসে ওঠে প্রিয় বাংলাদেশের ছবি। করতালি আর উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। ছোট ছোট শিশুদের কলরবে অনুষ্ঠান পায় ভিন্ন মাত্রা।

এই আয়োজনে প্রায় সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটির ছোট্ট বাংলাদেশী কমিউনিটিকে এক সূত্রে বেঁধেছিল। পড়াশোনার ব্যস্ততা, গবেষণা আর প্রবাস জীবনের নানা চ্যালেঞ্জের মাঝে এই দিনটি ছিল শুধুই আনন্দের, শুধুই বাঙালিয়ানায় ডুবে থাকার। দূর পরবাসে থেকেও তারা যেভাবে বাংলা সংস্কৃতিকে পরম যত্নে লালন করছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
এই উৎসব প্রমাণ করে, ভৌগলিক দূরত্ব যতই হোক না কেন, মনের মানচিত্র থেকে প্রিয় বাংলাদেশকে মুছে ফেলা যায় না। লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটির এই বৈশাখী উদযাপন ছিল শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা আর দেশের প্রতি গভীর টানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এ যেন দূর প্রবাসে এক চিলতে বাংলাদেশ, একরাশ ভালোবাসা আর একমুঠো স্মৃতি।










