বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম পর্বের লড়াই এখন শেষ লগ্নে। আর মাত্র কয়েকটা ম্যাচ বাকি। ২৯ জুন মধ্যরাত থেকেই শুরু হবে বিশ্বকাপের মরণপণ লড়াই। পরাজিত হলেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে হবে। সে লড়াই দেখার জন্য সবাই এখন উন্মুখ। সেকেন্ড রাউন্ড তথা নকআউট পর্বে কার সাথে কোন দেশের মুখোমুখি লড়াই হবে সেবিষয় নিয়ে চলছে বহুমুখী সমীকরণ। সেই সমীকরণে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ পেয়ে ফেভারিট দলকে নিয়ে একপক্ষ যেমন আগাম কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, তেমনি কঠিন প্রতিপক্ষ পেয়ে আরেক পক্ষ এখনই দুঃশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছে। তবে এরকম স্বস্তি আর অস্বস্তির মাঝে রীতিমতো ভূকম্পন তৈরি করেছে ইকুয়েডর নামের লাতিন আমেরিকার দলটি।
গ্রুপ ‘ই’র শেষ ম্যাচে ইকুয়েডর ফুটবলের ‘পাওয়ার হাউস’ বলে খ্যাত চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল জার্মানিকে ২-১ গোলে পরাজিত করে প্রমাণ করেছে এবারের বিশ্বকাপেও কোন আগাম অনুমান, জরিপ খুব একটা কাজে দেবে না। খোদ মাঠেই হবে সব ফয়সালা। এদিকে জার্মানিকে হারানোর আনন্দে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডানিয়েল নবোয়া সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন। জার্মানি এবং ইকুয়েডরের সাথে ম্যাচ চলাকালীন সময়ে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ছিলেন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ইকুয়েডরের কোচ-খেলোয়াড়রা মিলে এক অসীম আনন্দ উপহার দিয়েছে দেশবাসীকে।
ইকুয়েডরের কাছে জার্মানি হেরে যাওয়ায় রাউন্ড অব থার্টি-টুতে তাই নানান ধরনের অঘটনের আগাম আভাষ পাওয়া যাচ্ছে। তার আগে আজ মধ্যরাতে ফ্রান্স এবং নরওয়ের মধ্যেকার ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে বোস্টনে। এই ম্যাচ ধুন্ধুমার হবে বলে সবার বিশ্বাস। গ্রুপ আই’তে ফ্রান্স এবং নরওয়ে দুই ম্যাচে জিতে ৬ পয়েন্ট পেয়েছে। দুই দলের সেকেন্ড রাউন্ডও নিশ্চিত। কিন্তু এই ম্যাচে এমবাপে না আরলিং হালান্ড জিতবে সেটাই এখন মূল ক্লাইম্যাক্সের বিষয়।
আর্লিং হালান্ড ও কাইলিয়ান এমবাপে দুজনই এখন পর্যন্ত চারটি করে গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌঁড়ে রয়েছেন। তাদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নরওয়ে ও ফ্রান্স নিজেদের প্রথম দুটি ম্যাচ জিতে ইতিমধ্যেই নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে। তাই এই ম্যাচের বিজয়ীই হবে গ্রুপ আই-র চ্যাম্পিয়ন। ফ্রান্স দারুণ ছন্দে রয়েছে, নরওয়েও তাই। ফ্রান্স বিশ্বকাপের আগ থেকে টানা তিনটি ম্যাচ জিতেছে এবং টানা ছয় ম্যাচে প্রথম গোল করেছে। অন্যদিকে, নরওয়ে ভালো ফর্মে থাকলেও এবং তারা শেষ পাঁচ ম্যাচে অপরাজিত থাকলেও শেষ চার ম্যাচের একটিতেও ক্লিন শিট রাখতে পারেনি।
দেশের সাবেক তারকা ফুটবলার আবু ইউসুফও মনে করেন আজ মধ্যরাতে ফ্রান্স এবং নরওয়ের খেলা খুবই আকর্ষণীয় হবে। জার্মানির পরাজয়ের জের ধরে তিনি বলেন, ‘এটাই বিশ্বকাপ। কে কোথায় হোঁচট খাবে বলতে পারবে না। একটু থেকে একটু হলে বিপর্যয় চলে আসবে। সেকেন্ড রাউন্ডে এই দৃশ্য আরও বেশি দেখা যাবে।’
আবু ইউসুফ আশির দশকের প্রখ্যাত খেলোয়াড়। আবাহনীর জার্সি গায়ে খেলেছেন দীর্ঘ সময়। জাতীয় দলেও একসময় অনিবার্য ছিলেন। অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন। নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে খেলা ছেড়ে দেওয়ার পরপরই পেশাদার কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এখনও কোচিং পেশায় যুক্ত আছেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জে বসবাসকারী সাবেক এই ফুটবলারও মনে করেন, এই সময়ে এসে ফুটবলের দারুণ এক রূপান্তর এসেছে। সেই রূপান্তরের জায়গাটা হল, একজন ফুটবলারের নির্দিষ্ট পজিশন থাকলেও তিনি সেইখানেই স্থিতিশীল থাকছেন না। ফলে রক্ষণ থেকে আক্রমণ সবখানেই দেখা যায় সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করার প্রয়াস। ফুটবলের এই চিত্র ভালো লাগছে।
আবু ইউসুফের প্রিয় দল ব্রাজিল। জার্মানির ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ারের ফুটবল দর্শনকে সবসময়ই মাথায় রাখতেন। এখনও তার সেই দর্শনকেই মান্য করেন। তিনি মনে করেন ব্রাজিল চ্যাম্পিয়নের দীর্ঘপথে এগিয়ে যাচ্ছ। ছন্দহীন ব্রাজিল সেই খোলস থেকে বের হয়ে আসছে। ফলে ব্রাজিল নতুন আশাবাদের সঞ্চার করেছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের সামনে জাপান। কতোটা বাধা হয়ে দাঁড়াবে?
আবু ইউসুফের মতে, জাপান খুবই লড়াকু দল। কিন্তু বিশ্বকাপ বলে কথা। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলকে হারানো অনেকটাই দুঃসাধ্য। তবে এই বিশ্বকাপে তিনি কোনভাবেই চ্যাম্পিয়নশিপের টার্গেট থেকে আর্জেন্টিনাকেও পিছিয়ে রাখছেন না। তার মতে, ‘আর্জেন্টিনাও নিজেদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছ। মেসি দুর্দান্ত খেলছেন। নকআউটে আরও পরিকল্পনা করে এসব দল এগোবে। কোচের পারফেক্ট প্ল্যান আর খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, এই দুইয়ের সম্মিলনেই দ্বিতীয় রাউন্ড পার হতে হবে।’
তবে আবু ইউসুফও মনে করেন দ্বিতীয় রাউন্ডে অনেক ধরনের অঘটন ঘটবে। দ্বিতীয় রাউন্ডেই কেউ কাঁদবে, কেউ হাসবে।







