মহাকাশে বিভিন্ন প্রাণীদের গর্ভধারণের বিষয় নিয়ে চলছে নানা রকমের পরীক্ষা নিরীক্ষা। মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ এই ধরণের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হতে পারে এমন ধারণা থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
মহাকাশে প্রাণীদের গর্ভধারণের বিষয়টি নিয়ে প্রথম নিরীক্ষা করে রাশিয়ার ভোরোনজে ইনস্টিটিউট অফ বায়োমেডিকেল। তারা প্রথমে একটি তেলাপোকা নিয়ে এই গবেষণা শুরু করে। এরপর বিভিন্ন প্রাণী নিয়ে এই নিরীক্ষার কাজ করা শুরু হয়। এই গবেষণা ভবিষ্যতে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীদের মহাকাশে বংশ বিস্তারের ভাবনাকে প্রয়োজনে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করবে।
তেলাপোকা নাদেজদা
মহাকাশে প্রথম গর্ভধারণ করে নাদেজদা নামক একটি স্ত্রী তেলাপোকা। গর্ভধারণের পর এটি ৩৩টি বাচ্চা তেলাপোকার জন্ম দেয়। বাচ্চাগুলো বেশ বড় ছিল, দ্রুত ছোটাছুটি করছিল এবং পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া বাচ্চা তেলাপোকাদের থেকে আলাদা ছিল। সাধারণত তেলাপোকার বাচ্চারা দেখতে স্বচ্ছ হয় কিন্তু নাদেজদার বাচ্চারা গাঢ় লালচে বাদামী রঙের ছিল।
মেদাকা মাছ
মেদাকা মাছ মহাকাশে গর্ভধারণ করা প্রথম মেরুদণ্ডী প্রাণী। এই মাছ সাধারণত ছোট পুকুর, অগভীর নদী এবং খালে বাস করে। ১৯৯৪ সালে নাসা ১৫ দিনের মিশনে মেদাকা মাছ নিয়ে প্রথম পরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষায় ৪টি মাছ মোট ৪৩টি ডিম দিয়েছিল। তাদের মধ্যে আটটি ডিম মহাকাশে ফোটে এবং ৩০টি ডিম পৃথিবীতে অবতরণের পর ফোটে। মাছের বাচ্চাগুলো স্বাভাবিক ছিল এবং পৃথিবীতে ফিরে আসার পর মাছগুলো আবারও গর্ভধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল।

মহাকাশে ব্যাঙের গর্ভধারণ
১৯৯২ সালে নাসা প্রথম মহাকাশে কিছু ব্যাঙাচির নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করেন। এর ২ বছর পর ১৯৯৪ সালে প্রথম উভচর প্রাণী হিসেবে চারটি আফ্রিকান নখরযুক্ত স্ত্রী ব্যাঙকে মহাকাশে গর্ভধারণ করানো সম্ভব হয়। নাসার মহাকাশচারীরা হরমোন ইনজেকশনের মাধ্যমে পুরুষ ব্যাঙের শুক্রাণু স্ত্রী ব্যাঙগুলোর ডিম্বাণুর ওপর ফেলে দেয়। এরপর মহাকাশে এরা ডিম ফোটানো শুরু করে। ডিম থেকে জন্ম নেওয়া ব্যাঙাচিদের মাথা এবং চোখ বড় ছিল। কিছু গবেষকরা জানান ব্যাঙাচিদের বড় মাথা নিউরাল টিউবের ত্রুটির কারণে হতে পারে।

মহাকাশে ইঁদুরের প্রজনন পরীক্ষা
মহাকাশে ভ্রূণের বিকাশ এবং মহাকাশে ইঁদুরের জন্ম-পরবর্তী স্বাস্থ্য অধ্যয়নের জন্য একটি স্পেস শাটল মিশন পরিচালনা করে নাসা এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ। প্রথম ২টি পরীক্ষায় ১০টি গর্ভবতী ইঁদুরকে মহাকাশে পাঠানো হয়। গর্ভাবস্থার মাঝপথে তাদের মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জন্মদানের ঠিক কিছুদিন আগে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়। দেখা যায়, জন্ম নেওয়া ইঁদুরের বাচ্চাগুলোর চোখ, কান, নাকসহ মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশ হয়নি।
তৃতীয় পরীক্ষায় ৫ দিন, ৮ দিন এবং ১৪ দিন বয়সী ইঁদুরের বাচ্চাদের মহাকাশে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুদিন পর দেখা যায়, ৫ দিন বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ বেঁচে আছে। ৮ দিন বয়সীদের ৯০ শতাংশ বেঁচে ছিল কিন্তু স্বাভাবিকের তুলনায় তাদের শরীরের ওজন প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ১৪ দিন বয়সী বাচ্চাদের সবাই বেঁচে ছিল এবং পৃথিবীর ইঁদুরের বাচ্চাদের মতই স্বাভাবিক ছিল।
মহাকাশে টিকটিকির প্রজনন পরীক্ষা
২০০৭ এবং ২০১৩ সালে রাশিয়া মহাকাশে সরীসৃপের প্রজনন নিয়ে একটি পরীক্ষা চালায়। এই পরীক্ষার জন্য টিকটিকিকে বেছে নেওয়া হয়। তবে গবেষণাটি সফলতার মুখ দেখেনি। এই পরীক্ষা থেকে তারা কেবল অপরিপক্ক কয়েকটি ডিম খুঁজে পান। পরে ২০১৪ সালে এই ধরণের আরেকটি গবেষণায় মহাকাশে টিকটিকি ডিম ফোটালেও বাচ্চা টিকটিকিগুলো পৃথিবীতে অবতরণের আগেই মারা যায়। মহাকাশে টিকটিকি সফলভাবে প্রজনন ঘটাতে পারে কিনা তা এখনও একটি রহস্য।

মহাকাশে কোয়েল পাখির ডিমের বিকাশ নিয়ে গবেষণা
কোয়েল পাখির ডিমের মহাকাশে প্রজনন এবং বিকাশ নিয়ে গবেষণা করতে ১৯৭৯ সালে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল কোয়েলের ডিম মহাকাশচারীদের খাদ্যের উৎস হতে পারে কিনা তা জানা। তবে বেশিরভাগ ডিম অবতরণের সময়ই ভেঙে যায়। গবেষকরা পরের বছরগুলোতেও বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছু চেষ্টা চালিয়ে যায়। ইনকিউবেশনের মাধ্যমে ভ্রুণের বিকাশ করতে পারলেও অনেক ভ্রূণের চোখ, মস্তিষ্ক এবং ঠোঁটে ত্রুটি দেখা যায়। তাছাড়া মহাকাশ স্টেশনে বেড়ে ওঠা কোয়েল পাখিদের মধ্যে দেখা যায় ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ।

সূত্র: ম্যাসেবল, সোসাইটি ফর ফিউচার জার্নালিজম, সায়েন্স ডিরেক্ট, নাসা








