আন্দোলনের নেত্রী পরিচয়ের আড়ালে অনেক সময় চাপা পড়ে যায় রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার অসামান্য সাফল্যগুলো। তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি এমন কিছু প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও নীতি সংস্কার করেছিলেন, যা আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাঁর অবদানসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন (১৯৯১)
স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি এক যুগান্তকারী রাজনৈতিক সংস্কার করেন। রাষ্ট্রপতি-শাসিত সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাঠামোতে দাঁড় করান।
২. অর্থনৈতিক ভিত্তি ও কৃষি বিপ্লব
ভ্যাট চালু: ১৯৯১ সালে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে তিনি মূল্য সংযোজন কর চালু করেন, যা আজ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস।
কৃষিবান্ধব নীতি: কৃষকদের সুবিধার্থে তিনি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফ করেছিলেন। এছাড়া বিনামূল্যে সেচ সুবিধা এবং সারের দাম কমিয়ে তিনি বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পথে অনেক দূর এগিয়ে নেন।
৩. অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা
যমুনা ও মেঘনা-গোমতী সেতু: যমুনা বহুমুখী সেতুর নির্মাণকাজ ও অর্থায়নের সিংহভাগ তাঁর আমলেই সম্পন্ন হয়।
পরিবেশ ও ‘ক্লিন এয়ার’: ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করে তিনি পরিবেশ রক্ষায় বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিলেন। পাশাপাশি ২০০৩ সালে ঢাকার বাতাসকে দূষণমুক্ত করতে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী টু-স্ট্রোক বেবি ট্যাক্সি তুলে দিয়ে পরিবেশবান্ধব ‘সিএনজি অটোরিকশা’ চালু করেন।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নতুন বাহিনী গঠন
নতুন মন্ত্রণালয়: ২০০১ সালে তিনি প্রবাসীদের গুরুত্ব অনুধাবন করে স্বতন্ত্র ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়’ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা: দেশের বিশাল সমুদ্রসীমা রক্ষায় ১৯৯৫ সালে ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড’ এবং ২০০৪ সালে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ (র্যাব) গঠন করেন।
স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন: প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে সাবেক দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালে তিনি স্বাধীন ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (এসিসি) প্রতিষ্ঠা করেন।
৫. সামাজিক বিপ্লব, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়ন
নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তি: ১৯৯৩ সালে তিনি মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও ‘উপবৃত্তি প্রকল্প’ চালু করেন। বিশ্বব্যাংকের মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে একটি ‘গেম চেঞ্জার’।
উচ্চশিক্ষার প্রসার: দেশের মফস্বল পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হাজী মোহাম্মদ দানেশ ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর আমলেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
নারীর কর্মসংস্থান: তাঁর আমলেই পুলিশ বাহিনীতে প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য হারে নারী পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয় এবং জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নারী পুলিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল ট্র্যাজেডিতে ঘেরা। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি হারিয়েছেন স্বামী, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন প্রবাসে, আর বড় ছেলে তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে। নিজের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন, জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন বন্দিত্বে। তবু তিনি দল বা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেননি।
আজ তিনি চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন আধুনিক বাংলাদেশের ভিত্তি এবং আপসহীনতার এক বিরল দৃষ্টান্ত। একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আধুনিক, ডিজিটাল ও শিল্পনির্ভর অর্থনীতির পথে ধাবিত করার যে রূপরেখা তিনি তৈরি করেছিলেন, তাই আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এমন একজন শাসক হিসেবে, যিনি কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং দেশের মর্যাদা ও গণতন্ত্রের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।







