বাংলাদেশ

‘অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে’

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান

অভিনন্দন অনুষ্ঠানে পুরস্কার গ্রহণ করছেন অতিথিরা. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

অভিনন্দন অনুষ্ঠানে একদল ব্যক্তি পুরস্কার গ্রহণ করছেন, পেছনে বাংলা ভাষায় লেখা ব্যানার দেখা যাচ্ছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

অভিবাসী কর্মীরা আমাদের সোনার সন্তান। বাংলাদেশে বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স সরাসরি রিজার্ভে যোগ হচ্ছে। প্রবাসী আয়ে অন্যান্য রপ্তানি খাতের মতো ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের সুযোগ নেই। প্রবাসীরা বঞ্চনা, হয়রানি, অপমান এমনকি অপমৃত্যুরও শিকার হচ্ছেন। অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) ঢাকার এফডিসিতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে অভিবাসী কর্মীদের মানবাধিকার নিশ্চিতে আয়োজিত ছায়া সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত অভিবাসী কমীর্দের ন্যায্য অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো কাঙ্খিত সেবা দিতে পারছে না। নারী শ্রমিকদের প্রতি সহিংসতা ও হয়রানী প্রতিরোধে দূতাবাসগুলোকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রবাসে কারাগারে আটক বাংলাদেশীদের মুক্তির বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কাজ করছে। সৌদি আরবে দুজন অভিবাসী নিহত হওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও মানবাধিকার কমিশনের প্রচেষ্টায় রক্তপণ হিসেবে ৩০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেছে। কাজ হারিয়ে যেসব অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছে তাদের সামাজিক সুরক্ষা ও রি—ইন্টিগ্রেশনের উপর আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের অভিবাসী কর্মীরা তাদের শ্রমে ঘামে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে থাকেন। যে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা চলতি বছর ২৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মূদ্রা দেশে পাঠিয়েছে, তাদের সামাজিক মর্যাদা ও স্বীকৃতি এখনো আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। সরকারের নীতি-কৌশল, প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বৃদ্ধি ও ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ প্রক্রিয়া সহজ করা হলে প্রতি বছর প্রবাসী আয় থেকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। আমাদের জিডিপিতে প্রবাসী আয়ের অবদান ৫.২ শতাংশ অথচ নেপালের জিডিপিতে প্রবাসী আয়ের অবদান ২৭ শতাংশ। শোভন কর্মপরিবেশের অভাব, ন্যায্য মজুরি না পাওয়া, অদক্ষতা ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিরাপদ অভিবাসনের বড় অন্তরায়। বিদেশ থেকে পাসপোর্টবিহীন আউট পাস নিয়ে বিপুল সংখ্যক কর্মীর দেশে আসার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে। কেন এসব কর্মীরা বিনা পাসপোর্টে আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরে আসলেন তা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা উচিৎ।

তিনি আরও বলেন, আমি শঙ্কা করছি বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের প্রধান রপ্তানিখাত তৈরি পোশাক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এক সময়কার সোনালী আঁশ থেকে প্রধান রপ্তানি আয় মুখ থুবড়ে পড়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য থেকে রপ্তানি আয় কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌছাতে পারছে না। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুকি, আর্টিফিশিয়াল লেদারের ব্যবহার বৃদ্ধি, চামড়া কারখানাগুলো পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স রক্ষা করতে না পারায় এ খাত থেকে ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। আমরা যদি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করে দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারি, তাহলে আমাদের কৃষি যেভাবে বিপ্লব ঘটিয়েছে ঠিক একইভাবে প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটাতে পারবে। তাই দরকার আমাদের অভিবাসী কমীর্দের প্রতি সদয় হওয়া, মানবিক আচরণ করা ও তাদের শ্রম ও ঘামের মর্যাদা দেওয়া।

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির পক্ষ থেকে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে ১০ দফা সুপারিশ করেন:

১) সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক, শিল্পীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য যেভাবে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট  দেওয়া হয় অভিবাসী কমীর্দের জন্য  সেভাবে আবাসিক পল্লী গড়ে তুলে প্লট/ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া। যারা বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাবে তাদের অগ্রাধিকার প্রদান।

২) অভিবাসীদের সন্তানদের জন্য সেনাবাহিনী পুলিশের মতো বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা করা।

৩) সামাজিক সুরক্ষা ভাতার মতো স্বল্প আয়ের অভিবাসী কমীর্দের বিশেষ ভাতা প্রদানসহ উৎসবভাতা প্রদান করা।

৪) নামমাত্র সুদে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকসহ সকল তপসিলী ব্যাংকে বিদেশ গমনেচ্ছুক কমীর্দের ঋণ প্রদান করা। সরকার এক্ষেত্রে প্রত্যেক সিডিউল ব্যাংকে তাদের প্রদত্ত ঋণের অন্তত ৫ শতাংশ স্বল্পসুদে অভিবাসী ইচ্ছুক কর্মীদের অভিবাসন খরচ মেটাতে ঋণ প্রদান করা।

৫) কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আবারো বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করা।

৬) মাইগ্রেশন ডিপ্লোমেসি আরো জোরদার করা।

৭)  ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রবাসী দিবসে চাকরি মেলার ব্যবস্থা করা।

৮) অভিবাসন খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বিএমইটির উদ্যোগে গণশুনানী করে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া।

৯) দূতাবাসগুলোকে আরও অধিক শ্রমবান্ধব হওয়া।

১০) পেনশন স্কীম অভিবাসীদের জন্য আরো আকর্ষণীয় করা।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) -এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন।

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানটি আয়োজনে সহযোগিতা করে বোয়েসেল ও হেলভেটাস বাংলাদেশ এর সিমস্ প্রকল্প। প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত অর্থ বৈদেশিক আয়ের মূল চালিকাশক্তি শীর্ষক ছায়া সংসদে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ এর বিতার্কিকদের পরাজিত করে সরকারি বাঙলা কলেজ এর বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মুহাম্মদ রইস, ড. এস এম মোর্শেদ, সাংবাদিক মোঃ তৌহিদুল ইসলাম, সাংবাদিক ঝুমুর বারী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মো: আবুল বাশার।

প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী দলকে ট্রফি ও সনদপত্র দেওয়া হয়।

বিষয়:অভিবাসী ছায়া সংসদ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…