৭ নভেম্বরের পরদিন: ক্যান্টনমেন্টে শৃঙ্খলা ফেরানোর সেই রুদ্ধশ্বাস ২৪ ঘণ্টা

ছবি: সংগৃহীত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহর। ঢাকা সেনানিবাসে হঠাৎ গুলির শব্দ, ট্যাংকের চলাচল আর ‘সিপাহি-সিপাহি ভাই ভাই’ স্লোগানে বদলে যায় রাতের পরিবেশ। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে পরিচিত ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদলের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
ক্যান্টনমেন্টে তখন কার্যত ভেঙে পড়েছে সামরিক বাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলা। একদিকে সৈনিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা দাবি, অন্যদিকে কর্মকর্তাদের নিরাপত্তাহীনতা। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে ইউনিট থেকে ইউনিটে ছুটে বেড়ান জিয়াউর রহমান।

অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন তার বই ‘রক্তাক্ত দিনগুলি: ১৯৭৫-১৯৮১’-এ ৭ নভেম্বরের রাত ও পরদিনের ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ দিয়েছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, ৭ নভেম্বর মধ্যরাতে সেনানিবাসে গুলির শব্দ ও স্লোগানে তার ঘুম ভাঙে। তিনি সেনানিবাসের সড়কে সৈন্যভর্তি সামরিক যান চলাচল করতে দেখেন।
সাখাওয়াত হোসেনের বিবরণ অনুযায়ী, ৮ নভেম্বর সকালে তিনি জানতে পারেন, কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা হত্যার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নারী চিকিৎসক হামিদা, ডেন্টাল সার্জন করিম, ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও লেফটেন্যান্ট মোস্তাফিজ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত আক্রোশসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করেছিল।
সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনায়, ৮ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো। অন্যদিকে অধিকাংশ সৈনিকের হাতেই ছিল অস্ত্র। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর স্বাভাবিক কমান্ড কাঠামো ফিরিয়ে আনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

কমান্ড কাঠামো ফেরাতে জিয়ার তৎপরতা
৮ নভেম্বর সকাল থেকেই সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তৎপর হন জিয়াউর রহমান। তিনি বিভিন্ন ইউনিটে গিয়ে সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর প্রচলিত নিয়ম ও শৃঙ্খলা মেনে চলার আহ্বান জানান।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনের বিবরণ অনুযায়ী, ওই দিন বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যারাকের কাছে সৈনিকদের একত্র করেন জিয়া। সেখানে তিনি সৈনিকদের অস্ত্র জমা দিয়ে নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সৈনিকদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেন।
পরিস্থিতি তখন কতটা বিপজ্জনক ছিল, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনায়। তার মতে, সেনানিবাসে কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল খুবই কম, অথচ অধিকাংশ সৈনিক ছিলেন সশস্ত্র। এমন বাস্তবতায় সামরিক নেতৃত্বের নির্দেশ কার্যকর করা সহজ ছিল না।
জিয়াউর রহমানের সামনে তখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত, সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, নিজের নেতৃত্বের প্রতি সৈনিকদের আস্থা ধরে রাখা। সেনানিবাসে তার সরাসরি উপস্থিতি এবং অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ এই দুই লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
তবে ৮ নভেম্বরেই সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়নি। পরবর্তী কয়েক দিনও সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা ছিল। ৭ নভেম্বরের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে জিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হয়। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।






