বাংলাদেশ

আগামীকাল শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা

দুর্গাপূজা

ছবি: সংগৃহীত

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা নিয়ে আগামীকাল উদযাপিত হবে শুভ মহালয়া। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানো হবে এবং শুরু হবে শারদীয় দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা।

মহালয়া কেবল শারদীয় দুর্গাপূজার সূচনাতিথি নয়, পরলোকগত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাদের আত্মার শান্তি কামনায় তর্পণের (জলদান) মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদনেরও একটি পবিত্র দিন।

পক্ষকাল পিতৃপক্ষের অবসানের পরে শুরু হয় দেবীপক্ষ। পিতৃপক্ষ এবং দেবীপক্ষের সন্ধির তিথি হলো মহালয়া। মহালয়া অমাবস্যা, শারদীয়া দেবী দুর্গার অমাবস্যার বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয়া দুর্গাপূজা। শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গা মহিষাসুর নিধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এই মহালয়া তিথিতে। এই তিথিতেই শারদীয়া দেবী দুর্গা মর্ত্যে আগমন করেন। ভোরের আলো ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পিতৃপক্ষ শেষে শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষ। সকালে চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে মর্ত্যে দেবী দুর্গাকে জানানো হবে আহ্বান।

মহালয়া উপলক্ষ্যে চন্ডীপাঠ ছাড়াও বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে মহালয়ার ঘট স্থাপন ও বিশেষ পূজা করা হবে। মূলত মহালয়া মানেই দুর্গাপূজার দিন গণনা শুরু হয়ে যাওয়া। দেবীর আগমনের প্রতীক্ষায় ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।

মহালয়া দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুরাণে আছে- দুর্গোৎসবের তিনটি পর্ব মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা। মহামায়া অসীম শক্তির উৎস। পুরাণ মতে, মহালয়ার দিনে দেবী দুর্গা মহিষাসুর বধের দায়িত্ব পান। শিবের বর অনুযায়ী কোনো মানুষ বা দেবতা কখনো মহিষাসুরকে হত্যা করতে পারবে না। ফলে অসীম ক্ষমতাশালী মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর হতে চায়। তাই ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব ত্রয়ী সম্মিলিতভাবে ‘মহামায়া’র রূপে অমোঘ নারীশক্তি সৃষ্টি করলেন এবং দেবতাদের ১০টি অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে সিংহবাহিনী নিয়ে দেবী দুর্গা ৯ দিনব্যাপী যুদ্ধে মহিষাসুরকে পরাজিত ও হত্যা করে।

মহালয়ার ভোর থেকেই শুরু হয় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করা। সনাতন ধর্মে বলা হয়, পিতৃপক্ষে প্রয়াত আত্মারা স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে আসেন। মৃত আত্মীয়পরিজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার মঙ্গল কামনা করেন অনেকে। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে জল-তিল-অন্ন উৎসর্গ করে তর্পণ করা হয়।

আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হলেও মূলত আগামীকাল থেকেই দুর্গাপূজার আগমনধ্বনি শোনা যাবে। দুর্গাপূজার এই সূচনার দিনটি সারা দেশে বেশ আড়ম্বরপূর্ণভাবে উদযাপিত হবে। মহালয়া উপলক্ষ্যে বিভিন্ন মন্দির ও পূজা কমিটি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। আগামী ২১ অক্টোবর ‘বিজয়া দশমী’র মাধ্যমে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।

এদিকে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা বহনকারী মহালয়া উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন মন্দিরে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। ওইদিন ভোরে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুবাশীষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়া অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এছাড়া শনিবার ভোরে রমনা কালী মন্দিরেও মহালয়া উদযাপিত হবে বলে জানিয়েছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মিন্টু বসু।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূজা ও ব্রাহ্মণদের বস্ত্র দানের মাধ্যমে তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এই দিনেই দেবী দুর্গা কৈলাসের নিজ আবাস থেকে মর্ত্যলোকে তার পিত্রালয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন, যা দুর্গাপূজা উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়।

এ ছাড়া ঢাকার রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, সিদ্ধেশ্বরী মন্দির, স্বামীবাগের লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দির, রামসীতা মন্দির এবং জয়কালী মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভোর থেকেই চণ্ডীপাঠ, চণ্ডীপূজা ও বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহালয়া উদযাপন করা হবে। এ সময় মন্দিরগুলোতে মহালয়ার ঘট স্থাপনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় (ঘোটক) চড়ে আসবেন এবং নৌকায় চড়ে বিদায় নেবেন।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন,‘এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এ বছর দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।

হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবারের সাথে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।

এ বিষয়ে বাসুদেব ধর বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’

পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সারা দেশের পূজা উদ্‌যাপন কমিটি, মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মণ্ডপ নির্মাণ ও সাজসজ্জা, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি উৎসবকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে ভক্ত-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে। আনন্দ, উৎসব ও পারস্পরিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।

বিষয়:শারদীয় দুর্গাপূজা ২০২৬ শারদীয় দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুভ মহালয়া

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…