মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পর নিজেদের ‘সার্বভৌম ও স্বাধীন’ বলে ঘোষণা দিয়েছে তাইওয়ান। তবে একই সঙ্গে দ্বীপটির সরকার জানিয়েছে, তারা চীনের সঙ্গে বিদ্যমান ‘ক্রস-স্ট্রেইট স্ট্যাটাস কু’ বজায় রাখতে চায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার তাদের পরিকল্পনা নেই।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তাইওয়ান এ অবস্থান জানায়। এর আগের দিন বেইজিং সফর শেষে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাইওয়ানের স্বাধীনতা প্রশ্নে মন্তব্য করেন।
চীন সফর শেষে রাজধানী বেইজিং থেকে ফেরার পথে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমি কাউকে স্বাধীন হয়ে যেতে দেখতে চাই না। স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসা চীনের অবস্থানের প্রসঙ্গেই তিনি এ মন্তব্য করেন।
তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি বহু দশক ধরে উত্তেজনাপূর্ণ একটি ইস্যু। এর শিকড় ১৯৪০-এর দশকের চীনা গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করে না, তবুও ধারাবাহিক মার্কিন প্রশাসন অস্ত্র বিক্রি ও বিভিন্ন কূটনৈতিক ইঙ্গিতের মাধ্যমে দ্বীপটিকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। পাশাপাশি, চীনের হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে রক্ষা করতে পারে এমন ইঙ্গিতও বহুবার দেওয়া হয়েছে।
তবে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প পূর্বসূরিদের তুলনায় কিছুটা সংযত অবস্থান নেন। তিনি বলেন, আমাদের ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে গিয়ে যুদ্ধ করার কথা। আমি সেটা চাই না। আমি চাই পরিস্থিতি শান্ত হোক, চীনও শান্ত থাকুক।
তিনি আরও বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না। বর্তমান অবস্থা যেমন আছে তেমন থাকলে চীনও সেটি মেনে নেবে বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমরা এমন পরিস্থিতি চাই না যেখানে কেউ বলবে, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সমর্থন দিচ্ছে, তাই আমরা স্বাধীন হয়ে যাচ্ছি।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরে তাইওয়ান ইস্যু বড় একটি আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে বলেন, তাইওয়ান হচ্ছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
শি সতর্ক করে বলেন, এটি ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে, যা পুরো চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারে।
পরে প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতায় শি খুবই দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন।
তবে ট্রাম্প জানান, তিনি এ বিষয়ে কোনো পক্ষেই প্রতিশ্রুতি দেননি। এ ছাড়া, তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের নতুন অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদনের বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানান ট্রাম্প। মার্কিন কংগ্রেস ইতোমধ্যে এ প্যাকেজ অনুমোদন করেছে।
তিনি বলেন, আমি এখনো অনুমোদন দিইনি। পরিস্থিতি দেখি। আমি অনুমোদন দিতেও পারি, আবার নাও দিতে পারি।
দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ান প্রশ্নে কৌশলগত অস্পষ্টতা নীতি অনুসরণ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটন তাইপের সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে না এবং তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেও স্বীকৃতি দেয় না।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ওয়ান চায়না নীতি মেনে চলে, যার আওতায় বেইজিংয়ের এই অবস্থানকে স্বীকার করা হয় যে তাইওয়ান চীনের অংশ যদিও তা আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করা হয় না।
চীনের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি ওয়াশিংটন।
২০২২ সালে ট্রাম্পের পূর্বসূরি জো বাইডেন এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, নজিরবিহীন হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের পাশে দাঁড়াবে। তবে পরে তার প্রশাসন জানায়, সরকারি নীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শনিবারের বিবৃতিতে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ট্রাম্প ও মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটনের নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার কথাও জানায় তাইপে।
তাইওয়ান আরও দাবি করে, এই অঞ্চলে প্রকৃত নিরাপত্তাহীনতার উৎস হলো চীনের সামরিক হুমকি। বিবৃতিতে বলা হয়, তাইওয়ানের জন্য অস্ত্র বিক্রি শুধু নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নয়, এটি আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ ব্যবস্থাও।







