ফুটবলে নকআউট মানেই চরম নাটকীয়তা, দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তার গল্প। কে কাকে টেক্কা দিয়ে পরের ধাপে যাবে তা যেন ক্ষণে ক্ষণে নির্ধারিত হতে থাকে। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপের পর আজ থেকে শুরু হবে ৮ দলের মধ্যে মহা উত্তেজনাময় কোয়ার্টার ফাইনাল। এ পর্বে যারা জয়ী হবে তারা বিশ্বকাপ ট্রফি মুঠোবন্দির লড়াই-এ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। আর যারা পরাজিত হবে তাদেরকে একরাশ দুঃখ আর বঞ্চনাকে সঙ্গী করে বিদায় নিতে হবে চূড়ান্ত লড়াই থেকে।
আজকের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালে এদেশের ক্রীড়ামোদীদের প্রিয় দুই দলের মধ্যে প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল এবং দ্বিতীয় ম্যাচে আর্জেন্টিনার খেলা থাকার কারণে আমজনতার উৎসাহ আর উদ্দীপনার শেষ নেই। ঘরে-বাইরে সর্বত্র চলছে নানান জল্পনা আর কল্পনা। কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ম্যাচে রাত ৯টায় এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে এবারের বিশ্বকাপ ট্রফির অন্যতম দাবিদার ব্রাজিল এবং গত বিশ্বকাপের রানার্সআপ দল ক্রোয়েশিয়া। রাত ১টায় লুসেইল স্টেডিয়ামে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডস।
গ্রুপপর্বে ব্রাজিল প্রতিপক্ষ সার্বিয়া এবং সুইজারল্যান্ডকে পরাজিত করলেও ক্যামেরুনের কাছে হেরে যায়। দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিল ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে সাউথ কোরিয়াকে পরাজিত করে নিজেদের ছন্দময় ফুটবলকে আরও নতুন রূপে উদ্ভাসিত করে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্রোয়েশিয়া এশিয়ার ফুটবলের অন্যতম শক্তি জাপানকে টাইব্রেকারে পরাজিত করে উঠে এসেছে। গ্রুপপর্বে ক্রোয়েশিয়া মরক্কোর সাথে ড্র, কানাডাকে ৪-১ গোলে পরাজিত এবং শেষ ম্যাচে বেলজিয়ামের সাথে ড্র করে দ্বিতীয় রাউন্ডের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। সবারই ধারণা আজ ব্রাজিলই জিতবে। কিন্তু প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়াও যে এক ইঞ্চি মাটি ছাড়বে না এও সত্য।
আজকের ম্যাচে ব্রাজিল যে নিঃসন্দেহে ফেভারিটের ফেভারিট এটি বোধ হয় যে কেউ স্বীকার করবেন। কিন্তু এরপরেও কিছু কথা থেকে যায়। মাঠে প্রকৃত লড়াই বিভিন্ন কৌশলে কে কতটুকু স্পন্দিত হতে পারছে, মাঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে- সেটাই জয় পরাজয়ের বড় নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে। এসব নিয়েই কথা হয় সাবেক তারকা ফুটবলার, বিশিষ্ট ক্রীড়াব্যক্তিত্ব দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুলের সাথে। ‘আবাহনীর টুটুল’ বলে যিনি এখনও প্রখ্যাত। ক্লাব এবং জাতীয় দলে সেন্ট্রাল ব্যাক বা স্টপার ব্যাক পজিশনে খেলেছেন ক্যারিয়ারের উজ্জ্বলতম সময়ে। ফুটবলকে বিদায় জানান ৯০ সালে।
আজকের ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ নিয়ে দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল বলেন, ‘এই বিশ্বকাপে টপ টু বটম- সবমিলিয়ে ব্রাজিল একটি কমপ্লিট দল। এই দলে রয়েছে একাধিক বিকল্প ফুটবলারও। প্রথম একাদশে যারা রয়েছে তারা সবাইই কুশলী ফুটবলার। গোলপোস্ট থেকে ফরোয়ার্ড লাইন- সব পজিশনই মজবুত। দলগত আবার ইনডিভিজুয়াল পারফরম্যান্সেও ব্রাজিল তুলনাহীন। ছন্দময়, আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দিয়ে ব্রাজিল প্রমাণ করেছে শৈল্পিক ফুটবল উপস্থাপনে তারা নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। ছোট ছোট দ্রুত লয়ের পাস, বল নিয়ন্ত্রণ, মধ্যমাঠ বা দুই উইং দিয়ে সম্মিলিত আক্রমণ- এমন প্রেক্ষিতে আজকের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের জয়ী না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। ব্রাজিল আজ জয়ী হয়ে ট্রফির দিকে আরও অগ্রসর হবে। এই ম্যাচ টপকানো ব্রাজিলের জন্য খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে করি না।’
টুটুল আরও বলেন, ‘ব্রাজিল টিম গোছানো এবং টেকনিক্যালি অনেক এগিয়ে। আর টিমে যারা খেলছে তারা গত দুই তিন বছর একসাথে খেলছে। ফলে বোঝাপড়াটাও চমৎকার। দলে স্টক প্লেয়ার অনেক বেশি। সেই তুলনায় ক্রোয়েশিয়া অনেক পিছিয়ে। আর তুলনামূলক বিচারে বিভিন্ন পজিশনে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের যে মান, সেই মানের সাথে ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড়দের সক্ষমতার অনেক ফারাক রয়েছে। সবমিলিয়ে ব্রাজিল অনেক এগিয়ে।’
ক্রোয়েশিয়ার সক্ষমতা প্রসঙ্গে টুটুল বলেন, ‘এবারের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া খুব উচ্চমানের দল নয়। গত বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের সাথে তাই এই দলের সক্ষমতা ও সাফল্য মেলানোর কোনো সুযোগ নেই। অনেকদূর অতিক্রম করে এসেছে তারা। এই দলে লুকা মদ্রিচ এবং ইভান পেরিসিচের বাইরে কুশলী খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুব একটা নেই। লুকা মদ্রিচের বয়সও কিন্তু বেড়েছে। মাঠে দম হারিয়ে ফেলছেন। অন্যদিকে ব্রাজিলের নেইমার, ভিনিসিয়াস, রিচার্লিসন, কাসেমিরো, লুকাস পাকুয়েতার অর্কেস্ট্রায় ব্রাজিলীয় ফুটবলের নান্দনিকতা উপস্থাপিত হবে। ব্রাজিলের গোলকিপারটাও দুর্দান্ত। আর ব্রাজিলের যে বৈচিত্র্যময় আক্রমণ সেই সম্মিলিত আক্রমণ ঠেকিয়ে ক্রোয়েশিয়ার জন্য জয়ের পথ উন্মুক্ত করা অনেক অনেক কঠিন কাজ। আমার বিশ্বাস ব্রাজিল খুব ভালোভাবে জিতবে। আর ব্রাজিলের জয় মানেই বিশ্বকাপ আরও আলোকময় হয়ে উঠবে।’

তবে টুটুল একই সাথে এও মনে করেন ফুটবল ১১ জনের খেলা এবং গোলের খেলা। গোল দিয়েই জয় পরাজয় নির্ধারিত হবে। ক্রোয়েশিয়াও অভিজ্ঞ দল। মাঠে জয়ের জন্য তাই তাদেরও চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকবে না। বাদ বাকি সব মাঠেই প্রমাণ হবে। ডাগআউটে যে দুই কোচ থাকবে তাদের নির্দেশনা, কৌশলও একটি ম্যাচের ফলাফলে অনেক প্রভাব ফেলে। তবে ব্রাজিলই আজ সববিবেচনায় অনেক এগিয়ে।
দেওয়ান শফিউল আরেফীন টুটুলের প্রিয় দল ব্রাজিল। সেই ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলকে সমর্থন করেন- ব্রাজিলের নান্দনিক এবং উৎকর্ষময় খেলার কারণে। তবে তার প্রিয় ফুটবলার বরাবরই জার্মানির ফ্রেঞ্জ বেকেনবাওয়ার। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার পজিশনে খেলা এই ফুটবলারকে তিনি খেলোয়াড়ি জীবনে আদর্শ মনে করতেন। এখনও তাকে স্মরণ করেন। তার স্টাইল, ব্যক্তিত্ব সবকিছুই টুটুলের হৃদয়ে গাঁথা আছে। খেলার মাঠে তাকে সবসময় স্মরণ করতেন, অনুসরণ করতেন।
এবারের বিশ্বকাপের তারকাদের মধ্যে ফ্রান্সের এমবাপেকে তিনি ভীষণরকম প্রতিভাবান বলে মনে করছেন। নেইমার বা মেসি নন, এমবাপের জাদুকে তিনি নতুন যুগের শুরু হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ‘রোনালদো, মেসি যুগ এখন শেষ, আরেক নতুন যুগ আসছে সেটি হয়ত এমবাপের যুগ।’








