সোনিয়া তাসনিমের নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক উপন্যাস ‘বিপ্রতীপ’

লেখক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট সোনিয়া তাসনিমের নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক উপন্যাস ‘বিপ্রতীপ’ শিগগিরই বাজারে আসছে। বহু বছরের পর্যবেক্ষণ, চিন্তা ও গবেষণার ফসল এই উপন্যাসে আদর্শ, রাজনৈতিক ক্ষমতা, সমাজ ও মানবিক বিবেকের জটিল সম্পর্ককে অনুসন্ধান করা হয়েছে।
‘বিপ্রতীপ’-এর অন্যতম প্রিয় পঙ্ক্তিতে উপন্যাসটির মূল ভাবনা উঠে এসেছে এভাবে, ‘আদর্শের পতাকা হাতে থাকা মানুষগুলো যখন ক্ষমতার অন্ধকারে নিজেদের হারিয়ে ফেলে, তখন প্রশ্ন ওঠে, পরাজিত আসলে কে, ব্যবস্থা নাকি মানুষের বিবেক?’
বৈচিত্র্যময় সাহিত্যচর্চার জন্য ইতোমধ্যে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন সোনিয়া তাসনিম। ঢাকায় জন্ম হলেও তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে চট্টগ্রামে। পাহাড়, সমুদ্র, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের বিচিত্র জীবন তার সৃজনশীল ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে। পারিবারিক পরিবেশেই ছোটবেলা থেকে বই ও সাহিত্যের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি মার্কেটিংয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যবসায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশ-বিদেশে বেশ কিছু পেশাগত প্রশিক্ষণও নিয়েছেন সোনিয়া তাসনিম। পেশাজীবনের শুরু ব্যাংকিং খাতে। পরে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। এর পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রাখেন। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য সাময়িকীতে তার প্রাথমিক লেখাগুলো প্রকাশিত হয়।
২০২০ সালে ‘মায়ের গয়নার বাক্স’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে লেখালেখিতে আত্মপ্রকাশ। এরপর ‘অসমাপ্ত’, ‘আগন্তুক’, ‘ফোর্থ ফ্লোর’, ‘দ্য ব্রেভার্স: কেনিয়া ভয়ংকর’, ‘বিক্ষণ’, ‘জেড-ভেনম’, ‘বিস্তৃত জলছবি’ ও ‘কেরালায় গহীনে’-সহ মোট নয়টি বই প্রকাশ করেছেন তিনি।
তার লেখায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভ্রমণ, রহস্য, মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক বাস্তবতা ও সমকালীন জীবনের নানা জটিলতা উঠে এসেছে। সাহিত্য, প্রবন্ধ, গবেষণা ও কলামে তিনি মানুষের বৈপরীত্য, আকাঙ্ক্ষা, দুর্বলতা, সংগ্রাম ও সম্ভাবনাকে অনুসন্ধান করেছেন।
গবেষণার ক্ষেত্রেও সক্রিয় সোনিয়া। বর্তমানে তিনি ‘আমিই নজরুল’ নজরুল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে কাজী নজরুল ইসলামের মানবতাবাদী মূল্যবোধ, সাম্যবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে কাজ করছেন। পাশাপাশি প্রমীলা-নজরুল আর্কাইভের আজীবন সদস্য হিসেবেও যুক্ত হয়েছেন।
সোনিয়া তাসনিমের গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিশ্বশক্তির পরিবর্তনশীল ভারসাম্য গুরুত্ব পেয়েছে।
বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায়ও তার বিশ্লেষণধর্মী ও সাহিত্য সংক্রান্ত লেখা প্রকাশ হয়েছে। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি চটক সাহিত্য সম্মাননা, সাহিত্য দিগন্ত লেখক পুরস্কার, বাঙালির কণ্ঠ পুরস্কার, ঢাকা সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার এবং উদার আকাশ ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী উৎসব সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। সম্প্রতি প্রমীলা নজরুল অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-এর জন্যও তিনি মনোনীত হয়েছেন।
সোনিয়ার সাহিত্যদর্শনে সাহিত্য শুধু নান্দনিকতার বিষয় নয়। সময় ও সমাজের প্রতিও এর দায় রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমার কাছে সাহিত্য শুধু শব্দের শিল্প নয়; আমরা যে সময়ে বাস করি, সেই সময়কে লিপিবদ্ধ করার একটি নৈতিক দায়িত্ব।’
কাজী নজরুল ইসলামের পাশাপাশি বেগম রোকেয়া ও জর্জ এলিয়ট তার সাহিত্যিক অনুপ্রেরণার গুরুত্বপূর্ণ দুই নাম। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সচেতনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসকে গুরুত্ব দেন তিনি।
‘বিপ্রতীপ’ সেই দীর্ঘ সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানেরই নতুন প্রকাশ। উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আদর্শের টানাপোড়েনের পাশাপাশি মানুষের বিবেক, সামাজিক বাস্তবতা এবং ব্যক্তির নৈতিক অবস্থানকে সামনে আনা হয়েছে। ফলে বইটি শুধু একটি সামাজিক-রাজনৈতিক আখ্যান নয়, বরং সময় ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে লেখকের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণেরও প্রতিফলন।






