পড়াশোনা ছেড়ে জামায়াতের রাজনীতিতেই ব্যস্ত শিবির
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা 'বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস' বই থেকে অনূদিত

ছবি: সংগৃহীত
যে মূল আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, তা থেকে সংগঠনটি বহু দূরে সরে গেছে বলে নিজের বইয়ে মূল্যায়ন করে গেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।
বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস বইয়ে তিনি বলেছেন, দেশ গঠন ও আগামী দিনের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া এই সংগঠনটি এখন মূল রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস বইয়ে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পাকিস্তানের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মওদুদীর ভাবনায় সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল স্বায়ত্তশাসিতভাবে ছাত্রদের পড়াশোনা নিশ্চিত করা এবং তাদের দেশের ভবিষ্যৎ যোগ্য নেতা হিসেবে গড়ে তোলা। নীতি অনুযায়ী, কেবল জাতীয় কোনো বড় সংকট বা ইস্যুতে তাদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
তবে বর্তমানে সেই আদর্শের কোনো প্রতিফলন নেই সংগঠনটিতে বলে মনে করেন আব্দুর রাজ্জাক। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে জামায়াতের আমীরকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে এই বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরেছিলেন। তিনি বইয়ে আফসোস করে বলেন, শিবির এখন জামায়াত থেকে প্রায় অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজ ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য মওদুদী যেভাবে তাদের চিন্তা করেছিলেন, তেমনটি ঘটেনি।
তার মতে, শিবিরের নেতাকর্মীরা সমাজ বা দেশের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে মূল দল জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নেই সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকে।
বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন এলেই শিবিরের পুরো শক্তি ও কর্মীবাহিনী জামায়াতের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণায় নামিয়ে দেওয়া হয়। অন্য সাধারণ মূলধারার রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোর মতো শিবিরও এখন পুরোপুরি রাজনীতিতে নিমজ্জিত। এর ফলে সংগঠনটির কর্মীদের স্বাভাবিক পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ উপযোগী করে গড়ে তোলার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে বলে বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস বইয়ে উল্লেখ করেন আব্দুর রাজ্জাক।
সঠিক দিকনির্দেশনা ও মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার কারণে এই ছাত্র সংগঠনটির থেকে ভবিষ্যৎ ইসলামী আন্দোলনের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরির মান আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। শিবিরের মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় ও মেধাবী ছাত্র থাকা সত্তেও যথাযথ নির্দেশনার অভাবে তাদের মেধা অপচয় হচ্ছে এবং তা দেশের কোনো কাজে আসছে না বলেও জানান তিনি।
আব্দুর রাজ্জাকের মতে, আজকের জামায়াতের রুকন ও কর্মীদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের। ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠা লাভ করে, কিন্তু উৎস শুরু হয় ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে গঠিত ইসলামী জমিয়তে তালাবার মাধ্যমে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান ইসলামী জমিয়তে তালাবা কাজ শুরু করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইসলামী জমিয়তে তালাবা বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির’ নামে নতুন করে এটি আত্মপ্রকাশ করে। মওদুদীর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক খুরশীদ আহমেদ আমাকে (আব্দুর রাজ্জাক) জানান যে, ১৯৫০-এর দশকে জামায়াতে ইসলামী জমিয়তে তালাবা গঠন ছিল মূলত মওদুদীর নিজের চিন্তায়।






