চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

বিরোধী পক্ষের জন্যও মানবিক ছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ

Nagod
Bkash July

দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের পক্ষে লেখালেখির পাশাপাশি স্বশরীরে মাঠে থেকে আজীবন লড়াই করে গেছেন লেখক, গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ। তবে বিরোধী মতাদর্শের কারও প্রতি অবিচার করা হলে এর বিরুদ্ধেও কথা বলেছেন তিনি। এমনকি বিরোধীদের ওপর অবিচার করাও সেক্যুলারিজম নয় বলে চ্যানেল আই অনলাইনকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।

Reneta June

২০১৮ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ। চিরচেনা সেই শ্বেতশুভ্র পোশাকে চ্যানেল আইয়ে এসেছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। সেসময় কথা হয় গুণী এই লেখক ও গবেষকের সঙ্গে। সমসাময়িক রাজনীতি, প্রতিবেশি দেশের সাথে সংকট এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ওনার মতামত ও চিন্তাভাবনা বোঝার চেষ্টা করি। সেসময় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকরা প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও বেতনের দাবিতে আন্দোলনরত ছিলেন। সেই বিষয় নিয়ে তার সুচিন্তিত মতামত জানতে দৃষ্টি আকর্ষণ করি।

এ বিষয়ে তিনি সেসময় বলেছিলেন: এই শিক্ষকরা ধর্ম শিক্ষা দেন বলে তাদের পক্ষে কথা বলা যাবে না, এমন ধারণা ঠিক নয়। তারা যদি শিশুদের সাম্প্রদায়িক শিক্ষা দেন তাহলে তার বিরুদ্ধে যেমন কথা বলতে হবে, তেমনই সরকারি রেজিস্ট্রেশনের পরও দীর্ঘদিন ধরে তাদের বেতন পাওয়ার বিষয়েও আমাদের কথা বলতে হবে। অপছন্দের কেউ যদি অমানবিকতার শিকার হন তাহলে তার পক্ষে কথা বলার নামই সেক্যুলারিজম। কিন্তু আমাদের বামপন্থীরা বিষয়টি বুঝতে না পারায় তারা একা একা হাঁটছে।

একপর্যায়ে ভারতের আসামের উদাহরণ দিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছিলেন: সেখানে যা চলছে এটা তো সাম্প্রদায়িকতার চরম রূপ। বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোন অঞ্চল থেকে হিন্দুরা আশ্রয় চাইলে তাদেরকে আশ্রয় দেয়া হবে, অথচ অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষ করে যেসব মুসলমান ৫০ এর দশক থেকে সেখানে বসবাস করে আসছেন, তাদেরকে বের করে দেওয়া হবে– এটা তো হতে পারে না। হিন্দুদের গ্রহণ করে মুসলমানদের তাড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা অমানবিক।

‘এখন আমরা যারা সেক্যুলারিজমের কথা বলি তারাও যদি ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং আসাম সরকারের মতো কথা বলি, পছন্দের লোক হলে এক রকমের কথা আর অপছন্দের কেউ অমানবিকতার শিকার হলে যদি আমরা চুপ থাকি তাহলে বিজেপি এবং আমাদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? সবার বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত কথা বলার নামই তো সেক্যুলারিজম। কিন্তু আমাদের বামপন্থীরা সেটা বুঝতে পারছে না’, বলে উল্লেখ করেছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ।

‘সরকার একসময় এসব প্রতিষ্ঠানকে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের রেজিস্ট্রেশন দিয়েছে। রেজিস্ট্রেশন দিয়ে এভাবে বছরের পর বছর বেতন না দেওয়া তো অমানবিক। এসব অমানবিক ঘটনায় সকলকে সোচ্চার হতে হবে। তাদের কারিকুলাম বা অন্য কোন বিষয়ে যদি সমস্যা থাকে তাহলে সেগুলো সমাধান করতে হবে। বেতন না দিয়ে এভাবে দায়সারা মনোভাব দেখানো সমাধান হতে পারে না।’

 

রোহিঙ্গা সংকটের যেহেতু সেসময় দগদগে ছিল, সেই বিষয়েও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পোড় খাওয়া নেতৃত্বের অভাবকে দায়ী করে তিনি বলেছিলেন: এসব বিষয়ে সফলতার জন্য দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজন। যাবতীয় সংকট দেখা এবং সেই সংকট মোকাবেলা করে নেতৃত্বের পর্যায়ে আসা লোকজন আমাদের খুবই কম। এ কারণে মিয়ানমারের পর ভারত আমাদের চাপে রাখার জন্য আসামকে উত্তপ্ত করছে। তারপরেও যতো দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে আসাম পরিস্থিতিও সফলতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বিশেষ করে কলাম লেখক হিসেবে তিনি সমাজের যাবতীয় অনিয়মের কঠোর সমালোচনা করতেন। ‘বাঘা তেঁতুল’ নামের মধ্যেই সেটা আঁচ করা যায়। এজন্য ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজন হওয়ার বিষয়কে তিনি পরোয়া করতেন না। এমনকি সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস-এ থেকেও বিএনপি-জামায়াত আমলে সরকারি সিদ্ধান্ত এবং কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে কলাম লিখেছেন তিনি। সেজন্য চাকরি ছাড়তেও দ্বিধাবোধ করেননি। তবে শুধু নিজের পক্ষের লোকজনের জন্যই যে লিখতেন বা বলতেন তা নয়, বরং বিরোধী মতাদর্শের মানুষদের সাথে অমানবিকতা হলে সে বিষয়েও সোচ্চার ছিলেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। ৭৫ বছর বয়সে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

গুণী সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের জন্মদিনে (২৩ অক্টোবর) সবার প্রতি মানবিকতাবোধের শিক্ষাই হোক আমাদের পাথেয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View