ইউক্রেন সংঘাত কি কেবলই ভূ-রাজনীতি, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাশিয়ার বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের লোভ? সম্প্রতি নিজের অনুষ্ঠানে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে এমনই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচিত সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন।
তার মতে, রাশিয়ার বিশাল আয়তন এবং অকল্পনীয় প্রাকৃতিক সম্পদই দেশটির জন্য কাল হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, পুতিনের অধীনে রাশিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখে পশ্চিমা নেতারা ঈর্ষান্বিত।
কার্লসনের এই বিশ্লেষণটি বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তার বক্তব্যের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
কার্লসনের মতে, পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ ধারণাই করতে পারে না রাশিয়া আসলে কতটা বিশাল।
তিনি বলেন, চীন ও ভারতের আয়তনকে একত্র করলেও রাশিয়ার সমান হবে না। সাইবেরিয়া একাই যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সমান, অথচ সেখানে বাস করে মাত্র এক কোটি মানুষ।
এই বিশাল ভূখণ্ডে লুকিয়ে থাকা সম্পদের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়ার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে গভীর জ্বালানি রিজার্ভ রয়েছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে তারা শীর্ষে। সোনা, রুপা, অ্যালুমিনিয়াম তৈরির বক্সাইট—সবই আছে প্রচুর পরিমাণে। বিশেষ করে কাঠের (টিম্বার) রিজার্ভে রাশিয়া অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
কার্লসন বলেন, মানুষের এখনো গাছ প্রয়োজন, কাগজ ও আসবাবের জন্য কাঠ প্রয়োজন। আর এর সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার সাইবেরিয়ায়। এ ছাড়া কৃষি, সার ও গমের উৎপাদনেও রাশিয়া শীর্ষে। তাঁর মতে, গ্রিনল্যান্ড যদি পশ্চিমাদের কাছে একটি ‘পুরস্কার’ হয়, তবে রাশিয়া হলো ‘সবচেয়ে বড় পুরস্কার’ (বিগেস্ট প্রাইজ)। আর এই সম্পদই শত শত বছর ধরে আক্রমণকারীদের রাশিয়ার দিকে টেনে এনেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নব্বইয়ের দশকের পরিস্থিতির কথাও মনে করিয়ে দেন কার্লসন। তিনি অভিযোগ করেন, দেওয়াল পতনের পরপরই একদল ‘লোভাতুর বিদেশি ব্যাংকার’ এবং রাশিয়ার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী (অলিগার্ক) মিলে দেশটিকে লুটেপুটে খেয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল শুধু সম্পদ লুট করা নয়, বরং পুরো জাতিকে হতাশা ও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া।
তিনি বলেন, সে সময় রাশিয়া ছিল ভুটানের চেয়েও গরিব, হতাশ এবং পরাজিত এক রাষ্ট্র। মাদক ও অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েছিল যুবসমাজ। কিন্তু ২০০০ সালে ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতায় আসার পর সব বদলে যায়। তিনি লুটেরাদের মন্দির থেকে বের করে দিয়েছেন, অথবা তাদের রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে বাধ্য করেছেন।
কার্লসনের দাবি, ২০২৬ সালের রাশিয়া আর ২০০০ সালের রাশিয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। তিনি বলেন, আজকের রাশিয়া পশ্চিমা ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে সমৃদ্ধ। এটি আর সেই গরিব দেশ নেই। স্পেইন বা যুক্তরাজ্যের চেয়েও রাশিয়ার অবস্থা এখন ভালো।
এই সমৃদ্ধিই পশ্চিমা নেতাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কার্লসন বলেন, বরিস জনসনের মতো নেতারা, যাদের পূর্বপুরুষরা একসময় বিশ্ব শাসন করত, তাদের দেশ আজ জরাজীর্ণ জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। অথচ রুশরা যাদের তারা অবজ্ঞা করে তারা বিশ্ব দাবা শাসন করছে এবং অর্থনীতিতে ভালো করছে। এটি পশ্চিমা নেতাদের নিজেদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আর এই ক্ষোভ থেকেই তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে কার্লসন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণ নিয়েও কথা বলেন। তিনি প্রচলিত পশ্চিমা বয়ানকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দেন। তাঁর দাবি, এটি কোনো বিনা উসকানিতে চালানো আগ্রাসন নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন, ২০০১ সালে ভ্লাদিমির পুতিন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের কাছে ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কার্লসন বলেন, পুতিন বলেছিলেন, আমি আপনাদের জোটে যোগ দিতে চাই, যাতে আপনারা নিশ্চিত হতে পারেন আমি পশ্চিম ইউরোপে হামলা করব না। কিন্তু বুশ সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ আমরা যে সংঘাত দেখছি, তা সেই প্রত্যাখ্যানের এবং রাশিয়ার সম্পদ দখলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই ফল।








