জ্বালানির দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি: অর্থনীতি ও জীবনযাপনে সংকটের নতুন সমীকরণ

ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি কখনোই কেবল একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা নয়। এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে, উৎপাদন থেকে পরিবহন, কৃষি থেকে শিল্প, বাজার থেকে সংসার কোথাও এর প্রভাব এড়ানোর সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর ও মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একধরনের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। দফায় দফায় জ্বালানি ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সেই চাপ আর সাময়িক থাকে না; বরং তা মানুষের আয়, ব্যয়, সঞ্চয়, ভোগক্ষমতা এবং জীবনযাপনের সামগ্রিক মানকে ক্রমাগত সংকুচিত করতে থাকে।
অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, জ্বালানি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ। বিদ্যুৎকেন্দ্র, কলকারখানা, কৃষিযন্ত্র, পণ্য পরিবহন, গণপরিবহন, নির্মাণশিল্প সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বেড়ে যায়। উদ্যোক্তা সেই বাড়তি ব্যয় নিজের মুনাফা থেকে দীর্ঘদিন বহন করেন না; পণ্যের দাম বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই তা চাপিয়ে দেন। এভাবেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে একধরনের ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ, দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে না, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর সঙ্গে যদি বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা, লোডশেডিং কিংবা জ্বালানির সংকট যুক্ত হয়, তাহলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে একই সঙ্গে বাড়তি ব্যয় ও উৎপাদন-বিঘ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অর্থাৎ উদ্যোক্তা বেশি দাম দিয়েও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি পাচ্ছেন না। এই দ্বৈত সংকট বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করে।
কৃষি খাতেও এর প্রভাব হবে গভীর। বাংলাদেশের কৃষি এখনো সেচ, জমি চাষ, ফসল কাটা, মাড়াই এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ডিজেলনির্ভর। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচের জন্য ডিজেলের ব্যবহার কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচের খরচ বাড়ে, জমি প্রস্তুত ও ফসল ঘরে তোলার ব্যয় বাড়ে। এর সঙ্গে সার, কীটনাশক ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়ার প্রবণতা যুক্ত হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়। কৃষক এই বাড়তি ব্যয় বহন করতে না পেরে উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন, আবার উৎপাদন অব্যাহত রাখলেও পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত কৃষকের সংকটের দায় গিয়ে পড়ে ভোক্তার পকেটে। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে ব্যয়বহুল করে তোলে।
পরিবহন খাতের অভিঘাত আরও দ্রুত দৃশ্যমান হয়। ডিজেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে যাত্রীভাড়া ও পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খাদ্যদ্রব্য, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই বাড়তি ব্যয় কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, শাকসবজি, নির্মাণসামগ্রী সবকিছুর বাজারমূল্যে এর প্রভাব পড়ে। ফলে মানুষ যখন বাজারে যান, তখন তাকে শুধু জ্বালানির বাড়তি দাম নয়, জ্বালানির কারণে বেড়ে যাওয়া প্রায় সব পণ্যের দামই বহন করতে হয়।
গৃহস্থালি জীবনযাত্রায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও কম নয়। শহরের যেসব পরিবার পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার করে, তাদের রান্নার ব্যয় সরাসরি বাড়তে পারে। অন্যদিকে যেসব পরিবার সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের সংকট আরও প্রকট। ২০২৬ সালের ২ নভেম্বর ১২ কেজি বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। মাত্র দুই মাসে এই সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; মাসিক পারিবারিক বাজেটে নতুন একটি চাপ।
রান্নার জ্বালানির ব্যয় বাড়লে পরিবারকে অন্য কোনো খাতে ব্যয় সংকোচন করতে হয়। কেউ খাদ্যতালিকা ছোট করেন, কেউ সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় কমান, কেউ আবার সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালান।
এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় মানুষের আয় একই হারে বাড়ছে না। একজন নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর কিংবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষের আয় প্রতিদিনের বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে না। অথচ জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার যাতায়াত, খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়। ফলে প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটি প্রকৃত মজুরি হ্রাসের একটি বাস্তব চিত্র। আয় অপরিবর্তিত থাকলেও জীবনযাপনের ব্যয় বাড়তে থাকলে মানুষ ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়েন। পরিসংখ্যানের হিসাবে তিনি হয়তো আগের শ্রেণিতেই থাকেন, কিন্তু তার জীবনযাপনের সক্ষমতা আর আগের জায়গায় থাকে না।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই আশঙ্কা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুনে সিপিডি জানিয়েছিল, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছিল এবং মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে ছিল। প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি, পরিবহন ও সেবার ব্যয় বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আগে থেকেই চাপে রয়েছে।
অর্থনীতির বৃহত্তর পরিসরেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। জ্বালানি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে টাকার বিনিময়মূল্য দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার টাকার অবমূল্যায়ন হলে জ্বালানি ছাড়াও অন্যান্য আমদানিপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একটি বৃহত্তর বৈদেশিক লেনদেনের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। সিপিডির ২০২৬ সালের একটি গবেষণাতেও বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য পরিণতি হিসেবে মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হারের ওপর চাপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই মূল্যবৃদ্ধি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, ইস্পাত, সিমেন্ট, কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য জ্বালানিনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হয় এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে না। কারণ, বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্ট দামে পণ্য কিনতে চান। ফলে উদ্যোক্তাকে কখনো মুনাফা কমাতে হয়, কখনো উৎপাদন সীমিত করতে হয়, আবার কখনো নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে। উৎপাদন কমলে শ্রমিকের কর্মঘণ্টা কমে, নতুন নিয়োগ বন্ধ হয়, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। একজন উচ্চ আয়েরু মানুষ তার গাড়ির জ্বালানি কিংবা রান্নার গ্যাসের বাড়তি ব্যয় বহন করতে পারেন। কিন্তু একজন নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে দৈনিক যাতায়াতের ভাড়া কয়েক টাকা বাড়াও গুরুত্বপূর্ণ। একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের কাছে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম কয়েকশ টাকা বৃদ্ধি মানে মাসের অন্য কোনো প্রয়োজনীয় ব্যয় থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়া। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আয়বৈষম্যকে আরও প্রকট করতে পারে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা সাধারণত সরকারি ভর্তুকি বা সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা খুব বেশি পায় না, তারাও ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে।
সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পেছনে কিছু বাস্তব অর্থনৈতিক যুক্তি অবশ্যই রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থার লোকসান এসব বিবেচনা করে সরকারকে অনেক সময় মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এর আগে এপ্রিল ও জুনেও বিভিন্ন জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্ব কি কেবল সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায়? জ্বালানির দাম সমন্বয় যদি অর্থনৈতিক বাস্তবতার অনিবার্য পরিণতি হয়, তাহলে সেই সমন্বয়ের সামাজিক অভিঘাত মোকাবিলার দায়িত্বও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়ে কিংবা মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েই সরকারের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। বরং দেখতে হবে, এই মূল্যবৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক, এর প্রভাব কোন কোন খাতে পড়বে এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
এক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে দাম বাড়বে, অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সেই সুবিধা ভোক্তারা কত দ্রুত পাবেন তার একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে অপচয়, দুর্নীতি, অনিয়ম, অদক্ষতা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের দায় কেন বারবার সাধারণ ভোক্তাকে বহন করতে হবে, সেই প্রশ্নেরও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, কৃষি, গণপরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের জন্য সেচে জ্বালানি সহায়তা, গণপরিবহনে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ এবং খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় সরকারি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই।
সবচেয়ে বড় কথা, জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু আমদানি ও সরবরাহের হিসাব দিয়ে বিচার করলে চলবে না। এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তাও যুক্ত। একটি দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী, তার পরিচয় শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জিডিপির প্রবৃদ্ধি কিংবা বাজেটের আকারে পাওয়া যায় না; সাধারণ মানুষ সেই অর্থনীতির সুফল কতটা ভোগ করতে পারছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, আন্তর্জাতিক বাজার অস্থির হতে পারে, আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। কিন্তু সেই অস্থিরতার সব দায় যদি সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়, তাহলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নামে সামাজিক অস্থিতিশীলতাই তৈরি হবে। মানুষ তখন উন্নয়নের পরিসংখ্যানের সঙ্গে নিজের জীবনযাপনের কোনো মিল খুঁজে পাবেন না।
মনে রাখতে হবে, একটি পরিবার যখন মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে সন্তানের পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার খরচ কমিয়ে দেয়, তখন সেটি আর নিছক বাজারদরের সমস্যা থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে মানবিক উন্নয়নের সংকট। একজন কৃষক যখন উৎপাদন খরচের সঙ্গে পেরে ওঠেন না, একজন শ্রমিক যখন বাড়তি যাতায়াত ব্যয়ের কারণে সঞ্চয় করতে পারেন না, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যখন উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সাহস হারান, তখন তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত গোটা অর্থনীতিকেই দুর্বল করে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হয়তো রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় রাজস্ব ও ভর্তুকির ভারসাম্য তৈরি করবে, কিন্তু সেই ভারসাম্য যদি মানুষের সংসারে অস্থিরতা, বাজারে অগ্নিমূল্য এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করে, তাহলে তাকে প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বলা যায় না। রাষ্ট্রের অর্থনীতি মানুষের জন্য, মানুষ রাষ্ট্রের অর্থনীতির বোঝা বহন করার যন্ত্র নয়। এই মৌলিক সত্যটি নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধি করতে হবে।





