এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার খবরে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কি এতটাই আশঙ্কাজনক?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপকে সরাসরি নিরাপত্তা বিপর্যয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এটি একটি কূটনৈতিক রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মূল্যায়নের প্রতিফলন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল অবস্থার কথাই তুলে ধরে। বিশেষ করে সরকার পরিবর্তনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে নতুন সমন্বয় ও পুনর্বিন্যাস চলছে, তার প্রেক্ষাপটেই বিষয়টি বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সব মিশন থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত—এমন খবর প্রকাশ করেছে দেশটির একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম। কূটনীতির পরিভাষায় বাংলাদেশকে একটি ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশনসহ বাংলাদেশে থাকা দেশটির মোট পাঁচটি কূটনৈতিক মিশনই ‘নন-ফ্যামিলি পোস্টিং’-এর আওতায় আসবে। অর্থাৎ, এসব মিশনে কর্মরত কূটনীতিকদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারবেন না। তবে এই সিদ্ধান্তের পরও বাংলাদেশে থাকা ভারতের সব কূটনৈতিক মিশন ‘পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম চালিয়ে যাবে’।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ধারাবাহিক টানাপড়েন ও কিছু ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হওয়া বিক্ষোভের পর উভয় দেশই নয়া দিল্লি ও ঢাকাসহ তাদের মিশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
ঢাকায় গত ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান শরীফ হাদী নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামে ভারতীয় মিশনের বাইরে বিক্ষোভও হয়।
সবশেষ তারকা ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশ ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ নিয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচনের সপ্তাহ তিনেক আগে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার খবর দিল ভারতের সংবাদমাধ্যম।
বিষয়টা নিয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ভারতের চোখে বিষয়টা আশঙ্কাজনক। এটা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। হলি আর্টিজান হামলার পরও ইউরোপিয়ান কর্মরত নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কটা বৈরী থাকার কারণে দুই দেশের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বেড়ে চলেছে। আমাদের দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কটা অন্যান্য দেশ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও নির্ভর করে। এই সিদ্ধান্তে অন্য প্রবণতাও থাকতে পারে। যেহেতু ভারত নিষিদ্ধ একটি দলকে সমর্থন ও আশ্রয় দিয়েছে এবং নিষিদ্ধ দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
‘দুই দেশের মধ্যে দাম্ভিকতার সম্পর্কটা আরও নেতিবাচক হবে। যা ভারতের জন্য ক্ষতিকার কিছু হবে মনে করি না, তবে বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর’—তিনি যোগ করেন।
দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। এ লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ও পরিকল্পিত সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, যার মধ্যে একাধিক টার্গেটেড কিলিংয়ের ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে করার উদ্দেশ্যে যে কোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি বাড়িয়েছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ও এলাকায় বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরও দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘ওয়েল আন্ডার কন্ট্রোল’ রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ডিপ্লোম্যাটিক ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সৈয়দ মো. ফরহাদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও সংস্থার প্রতিনিধিদের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের বুদ্বেগ বা ঘাটতি নেই।
তিনি বলেন, সবসময়ের জন্যই বিদেশি কূটনৈতিক মিশন, রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা আমাদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক দায়িত্ব। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিপ্লোম্যাটিক ডিভিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো কূটনৈতিক মিশনগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং বিদেশি নাগরিকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট হুমকির তথ্য নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সব মিলিয়ে, ভারতীয় কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাহারকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় নিরাপত্তা সংকটের আলামত না বলে নির্বাচনকালীন কূটনৈতিক সতর্কতা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।








