এক. সন্ধ্যা নামার পর শুরু হতো আমাদের অভিযান। গুলিস্তান, নবাবপুর থেকে সওয়ার নিয়ে ধেই ধেই করে ছুটে আসা রিকশা নারিন্দা হয়ে শরতগুপ্ত রোডের ওপর দিয়ে বেগমগঞ্জের কাছে এসে যখন ডান দিকে কান্নি খেয়ে বসুবাজার লেনের প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন গলিতে ঢুকত তখন আশেপাশে গুপঘাতকের মতো ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা আমাদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য বেড়ে যেত হুহু করে।
রিকশা গলিতে ঢোকামাত্র আমরা রিকশার দুদিকের শিকে বাদুড় সেজে রিকশার পেছনে আলগোছে বসে পড়তাম। সেই ছোট বয়সেই আমাদের মধ্যে মানবিকতা কিংবা ভ্রাতৃত্ববোধের ব্যাপার-স্যাপার সুগভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল ফলে আমরা যখন অমন বাদুড়ের মতন রিকশার পেছনে বসে বিনে পয়সায় রিকশায় চড়ার সুযোগ নিতাম তখন আমাদের শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে শরীরটাকে কায়দা করে প্রায় ওজন শূন্য করে ফেলতাম। এতে করে রিকশা অলার ওপর তেমন চাপ পড়ত না বলেই আমরা মনে করতাম। ছোটবেলার এই এক সুবিধা সবকিছুকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে নেয়া যায়।
রিকশার সওয়ারী মহল্লার হলে আমাদের বরাতে বাড়তি সুবিধা মিলত। তারা দেখতে পেত আমরা সিঁধেল চোরের মতো সাবধানী পদক্ষেপে রিকশার পেছনে ঝুপ করে উঠে পড়েছি এবং বিনে পয়সায় তাদের সঙ্গে সওয়ার হয়ে রিকশায়ও চড়ছি। তারা আমাদের কিছু বলত না। হয়ত তাদের মধ্যে আমাদের নিয়ে এক ধরনের মানবিকতা কাজ করত, আহারে! গরীব পোলাপাইন, টেকা পয়সা নাইক্যা। মাগনায় একটু রেসকায় (রিকশা ) চড়বার মন চাইছে, চরুক না?
আর রিকশার সওয়ারী মানুষটি যদি অন্য মহল্লার হতো তাহলে সঙ্গে সঙ্গে খ্যাঁক খ্যাঁক করে চিৎকার চেঁচামেচি করে জানান দিত রিকশাওলাকে। সওয়ারীর চিৎকার চেঁচামেচিতে রিকশাওলা বুঝতে পারত, আরে! তাই তো সারা রাস্তা তো ভালোই চলছিল রিকশা কিন্তু এই গল্লিতে ঢোকার পর রিকশা কেন আট মাসের পোয়াতিগো মতন ওজনদার হয়ে গেল? তারপর অন্ধকার গলির যাবতীয় অন্ধকারকে দিনের আলোর মতো আলোকিত করে দিয়ে শুরু হতো রিকশাওলার গালাগালি। সে কি গালাগালি!
রিকশাওলা আমাদের বাপ-মা, মামা চাচা, দাদা দাদী, নানা নানী সহ চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে যাচ্ছেতাই গালাগাল তো করতই উপরন্তু আমাদের জন্মের যথার্থতা নিয়ে প্রশ তুলে গাল দিত। এমনকি আমাদের জন্মের ঠিক ঠিকানা সঠিক আছে কি নেই তা নিয়েও রহস্য করে অশ্লীল রকমের কটু গালাগাল দিত। সেসব গালাগালকে আমরা আমলেও নিতাম না কিন্তু মহল্লার বড় ভাইরা রিকশাওলাদের সেসব গালাগালে পীড়িত বোধ করতেন এবং আমাদের উপদেশ দিয়ে বলতেন, রিকশাআলারা তগোরে যেই ভাষায় গাইলায় ঐগুলা হুনলে পেটের বাচ্চা ভি চিল্লায়া কইব আমি আর পেটের ভিত্তে থাকুম না। আমারে জলদি বাইর কর…
রিকশাওলার গালাগাল কিংবা সওয়ারির চিৎকার চেঁচামেচিতে আমাদের কিছুই আসত যেত না। কারণ তার আগেই আমরা আমাদের রিকশায় চড়ার যে সাধ ছিল ( ইহাকে ‘মনজিলে মকসুদ’ও বলতে পারেন…) তা বিনে পয়সায় পূরণ করে ফেলেছি। রিকশাওলার কান স্তব্ধ করে দেয়া যাচ্ছেতাই রকমের গালাগালকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে রিকশার পেছন থেকে নেমে অন্ধকার গলির বাড়িঘরের দেয়াল টপকে আমরা দুধর্ষ রবিনহুডের মতো করে যে যার নিরাপদ গন্তব্যে চলে যেতাম।
কতটা বয়েস হয়েছে?
পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই।
পৃথিবীর কত দেশ ঘুরে বেড়ানো হলো।
কত মানুষ দেখা হলো।
কত কিছিম যে দেখা হলো।
কত কিসিম, কত মানুষের কতরকম কথা, কতরকম খিস্তি খেউরও শোনা হলো।
কিন্তু সন্ধ্যের পর অন্ধকার নেমে আসা বসুবাজার লেনের গলির রিকশাওলাদের সেই মধুর গালাগাল আর খিস্তিখেউরকে এখনো পৃথিবীর মধুর গালাগাল বলে মনে হয়।
দুই
ছোটবেলা বাড়ির বড়রা সিগারেট কেনার জন্য কখনো আধুলি, কখনো কাগজের টাকা দিয়ে আমাকে পাঠাত দোকানে। আমাদের বাড়ির কয়েকটা বাড়ি পর ছিল বিশাল মল্লিক বাড়ি। আগিলা দিনের এ ব্বড় জাহাজ মার্কা এক দোতলা বাড়ি। খয়েরি রঙের বাড়িটাকে দিনের বেলাতেও আমরা ছোটরা ভয় পেতাম। বাড়ির চারদিকে ছড়ানো ছিটানো ঝোপ ঝাড়। বাগান। ইঁদারা। মল্লিক বাড়ির এক দিকে ছিল সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দিনের বাড়ি অন্যদিকে ছিল ‘সুন্দরবনের বাঘ’ খ্যাত তোহা খানদের বাড়ি।
তোহা খান আমার বাবার বন্ধু ছিলেন। প্রায় বিকেলে তিনি আমাদের বারান্দায় এসে আড্ডা মারতেন। আড়ালে আবডালে আমরা তাঁর নাম দিয়েছিলাম সুন্দরবনের বাঘ। আমাকে সিগারেট কেনার জন্য সুন্দরবনের বাঘের বাড়ি অতিক্রম করে যেতে হতো মল্লিক বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে টিনের ছোট এক দোকানে। এই দোকান চালাতেন মোটা সোটা গড়নের এক জটাধারী সাধু। সাধু লোকটাকে যখনই দেখতাম মনে হতো তিনি বুঝি কখনোই ঘুমান না। মুরগির রানিখেত রোগ হলে মুরগি যেমন ঝিমায় সাধু লোকটাও সারাক্ষণ দোকানে চোখ বন্ধ করে ঝিমায়। মাথার দুপাশ দিয়ে সাধুর পাকানো চুলের গোছা বাচ্চা সাপেদের মতো ঝুলে থাকত। বিশাল তেল চকচকে বপু নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে সে দোকানদারী করত। তখন একটা স্টার সিগারেটের দাম ছিল পনেরো পয়সা।
সাতাত্তুর সালে এই দামের কারণে নিষ্পাপ মনের বালকের মনে প্রশ্নের উদয় হতো, হায় আল্লাহ! বড়রা কি বোকা! এত দাম দিয়ে এরা কেন সিগারেট খায়! তখন অবশ্য জানা ছিল না ছোটরাও একদিন বড় হয়ে স্বাভাবিক নিয়মে বড়দের মতোই বোকা য়ে যায়…। আমার আধুলি ভাগ্য খুব ভালো। আমাকে প্রায় সময়ই আধুলি দিয়ে বড়রা বলত, সাবু যা তো সাধুর দোকান থেকে তিনটা স্টার আন গিয়া।
কেউ বলত, পাঁচটা বগলা ( কিং স্টর্ক ) আনবি।
কেটু আনবি।
সাধুর দোকানে থরে থরে সাজানো থাকত মিনার।
গোল্ড ফ্লেক।
সিজার।
রমনা। এরকম আরও কত সিগারেট।
বড়দের সিগারেট আনার ঐ অর্ডার পাওয়ার পরই শুরু হতো আমার আনন্দ। এক আধুলি দিয়ে তিনটা স্টার কেনার পর সাধু চার কোনা সাইজের যে পাঁচ পয়সা ফেরত দিত তা নিয়েই ছিল আমার আনন্দের মাতম। পাঁচ পয়সা দিয়ে তখন তিনটা গুড়ের টেপা সন্দেশ পাওয়া যেত। হাত দিয়ে টিপে টিপে বানানো হতো বলে অমন নাম। গোল কাঁচের বয়ামের ভেতর থাকত পৃথিবীর সেরা সেই সন্দেশ।








