পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্জ্য সংকটের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও হৃদয়গ্রাহী ও বোধগম্য করে তুলতে শিল্পকলাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)।
রাজধানীর ধানমণ্ডির গ্যালারি চিত্রকে আয়োজিত পরিবেশভিত্তিক শিল্প প্রদর্শনী “আমাদের পরিবেশ: দূষণে ম্লান সৌন্দর্য” হয়ে উঠেছে শিল্প, পরিবেশ আন্দোলন এবং জনসচেতনতার এক অনন্য মিলনমেলা।
ব্যতিক্রমী এই প্রদর্শনীতে দেশের খ্যাতিমান ও উদীয়মান শিল্পীদের ৪৫টিরও বেশি শিল্পকর্ম স্থান পায়। শিল্পকর্মগুলোর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু ও রাসায়নিক দূষণ, ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক বর্জ্য, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং পরিবেশগত বৈষম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সৃজনশীলভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রদর্শনীতে প্রবেশ করলেই দর্শনার্থীরা যেন পরিবেশ সংকটের এক জীবন্ত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রচলিত গবেষণা, পরিসংখ্যান কিংবা নীতিগত আলোচনার বাইরে শিল্পীরা তাদের ক্যানভাসে পরিবেশের নীরব আর্তনাদকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা দর্শকদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল ইন্টারেক্টিভ “নিজের ব্যাগ নিজে আনুন” ডিআইওয়াই কর্নার। সেখানে দর্শনার্থীরা নিজেদের পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগে ছবি এঁকে পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের বার্তা ছড়িয়ে দেন। একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে টেকসই ও পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই এই আয়োজন।
এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিবেশ আন্দোলন ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক-এর নির্মিত প্রশংসিত তথ্যচিত্র ‘প্লাস্টিক ডিটক্স’ প্রদর্শন করা হয়। তথ্যচিত্রটিতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগের চিত্র তুলে ধরা হয়।
দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে একটি উদ্ভাবনী বায়োস্কোপ ইনস্টলেশন। ঐতিহ্যবাহী এই সাংস্কৃতিক মাধ্যমের মাধ্যমে প্লাস্টিকের উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব পর্যন্ত পুরো জীবনচক্র তুলে ধরা হয়। ফলে জটিল বিষয়গুলো সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন দর্শনার্থীরা।
প্রদর্শনীতে সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশবিদ, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মী, উন্নয়নকর্মী এবং তরুণ নেতৃত্বের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে পরিবেশ রক্ষা কেবল নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যেখানে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, পরিবেশের ক্ষতি কোনো প্রযুক্তিগত বা আইনি বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বলেন, “উপাত্ত বা রিপোর্ট যা পারে না, শিল্পকলা অনেক সময় তা সহজেই মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে।”
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সৈয়দ মারঘুব মোর্শেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বহুমাত্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, পরিবেশগত সংকট নিয়ে আলোচনা সাধারণত পরিসংখ্যান ও গবেষণাকেন্দ্রিক হলেও তা সবসময় মানুষের আবেগকে স্পর্শ করতে পারে না। “এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা পরিবেশের বাস্তবতাকে শিল্প ও গল্পের ভাষায় মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে চেয়েছি,” বলেন তিনি।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা মনে করেন, এই আয়োজন বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলনের একটি নতুন ধারা তৈরি করেছে। শিল্পকলার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি এবং মানুষকে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির কমিউনিকেশনস প্রধান মো. রোজার ইবনে আজাদ বলেন, টেকসই উন্নয়ন কোনো একক খাতের দায়িত্ব নয়; এটি সবার সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ।
সাবেক সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, পরিবেশ রক্ষায় কেবল নীতি ও আইন নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতার গভীর পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তন আনতে সৃজনশীল উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গ্যালারি চিত্রকের নির্বাহী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, শিল্প ও পরিবেশ আন্দোলনের এই মেলবন্ধন মানুষকে এমন বাস্তবতার সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত করে, যা অনেক সময় দূরবর্তী বা বিমূর্ত বলে মনে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ বলেন, সামাজিক পরিবর্তনে শিল্পীরা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পরিবেশ সংকটের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিল্প মানুষের মধ্যে সহানুভূতি ও সচেতনতা তৈরি করতে পারে।
এসডোর প্রতিনিধিরা জানান, পরিবেশ যোগাযোগে নতুন ও উদ্ভাবনী উপায় খুঁজে বের করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিয়ে এসে বৃহত্তর সমাজে আলোচনা ও সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
চারুকলা প্রদর্শনীতে দেশের ৪০ জন বিশিষ্ট ও সম্ভাবনাময় শিল্পী স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের শিল্পকর্ম শুধু পরিবেশের সংকটকেই তুলে ধরেনি, বরং প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানিয়েছে।
দর্শনার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ইতিবাচক সাড়া প্রমাণ করেছে যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে শিল্প, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার শক্তি অত্যন্ত কার্যকর। এই আয়োজন দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে মানুষের দৈনন্দিন ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করতে হলে এমন উদ্ভাবনী ও অংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।







