দেশের অন্তত দুই ডজন মাদ্রাসা শিক্ষককে প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে ভুয়া উপ-সচিব পরিচয়ে চার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে দুই প্রতারক।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, এখন পর্যন্ত প্রতারক চক্রটির খপ্পড়ে পড়ে ভোলার কমপক্ষে ১১টি মাদ্রাসা খবর পাওয়া গেছে। তবে ভুক্তভোগী আরও রয়েছে। চক্রটি আসলে টার্গেট করে করে খোঁজ নিয়ে ফাঁদ পেতে প্রতারণা করতো।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের ভুয়া উপ-সচিব ও প্রোগ্রাম অফিসার পরিচয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকদের এমপিওভূক্তি ও নব নিয়োগপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ানদের বেতন ভাতাদি নিয়মিত করে দেওয়ার আশ্বাসে চার কোটি এক লাখ ১৩ হাজার ৯৭২ টাকা প্রতারণা করে আত্মসাৎ করার অপরাধে জড়িত আসামি জুবায়ের ওরফে মো. আসাদুজ্জামান মানিক ওরফে লুৎফর রহমানকে বৃহস্পতিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ২টার সময় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ফলগাছা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরেক সহযোগী আব্দুল গফফার ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে সাইফুলকে রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর(উত্তর) একটি দল।
প্রতারণার শিকারদের একজন ভোলা চরফ্যাশনের কুচিয়ামোড়া ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল কামরুজ্জামান বাদী হয়ে ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর বংশাল থানায় মামলা দায়ের করলে, তদন্তভার যায় পিবিআই-এর কাছে।
যেভাবে হতো প্রতারণা
এমপিওভূক্তি বাতিল করা ও এমপিওভূক্তি বহাল রাখা, আবার কোনো মাদ্রাসার নব নিযুক্ত লাইব্রেরিয়ানদের বেতন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরী ও মাদ্রাসা শাখা থেকে নিয়মিত করে দেয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সুপারদের গ্রেপ্তার আসাদুজ্জামান মানিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ঢাকায় ডাকা হতো। ২০২১ সালের ২ আগস্ট মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও সুপারগণ বিশ্বাস করে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ সচিবলায়ের বিপরীতে ওসমানী মিলনায়তনের সামনে দেখা করেন জোবায়ের রহমান। যিনি নিজেকে শিক্ষা মন্ত্রাণালয়ের কারিগরী ও মাদ্রসা শাখার প্রোগ্রাম অফিসার পরিচয় দেন। তারা গাড়িতে উঠে বংশাল থানাধীন রায় সাহেব বাজারের সামনে যান। সেখানে ১২ লাখ টাকা চান জোবায়ের। সেদিন নগদ দেয়া হয় ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। বাকী টাকা চারটি মোবাইল নাম্বারে নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে আরও মোট ৪ লাখ ৬১ হাজার ১০০ টাকা পাঠান শিক্ষকরা। টাকা দিয়েও কাজ না হওয়ায় ও সকল মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মচারির বেতন বন্ধ হয়ে যায় ও নিয়োগ প্রাপ্ত লাইব্রিয়ানদের বেতনের অগ্রগতি না দেখতে পেয়ে সবাই খোঁজ নিতে থাকে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে খোঁজ-খবর নিয়ে তারা জানতে পারেন জুবায়ের ওরফে আসাদুজ্জামান মানিক নামে কোন প্রোগ্রাম অফিসার কর্মরত নেই।
পিবিআই ঢাকা মেট্রোর(উত্তর) প্রধান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তারা শতাধিক ভুক্তভোগী শিক্ষককে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।মাদ্রাসার প্রধানরা সহজ সরল ভাবে প্রতারকদের বিশ্বাস করেছিল। এক পর্যায়ে মোবাইল ফোন নাম্বার বন্ধ পেয়ে যখন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে খোঁজ নিতে যায় তখন তাদের ভুলটা নিজেদের কাছে ধরা পরে এবং বুঝতে পারেন তারা প্রতারিত হয়েছেন। এরকম আরও অজানা ভুক্তভোগী শিক্ষকদের আমরা যোগাযোগের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।
রিমান্ডে যা তথ্য দিল প্রতারকরা
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ পিবিআই কর্মকর্তা বলেন: পূর্ব হাজার বিঘা বটতলা সিনিয়র মাদ্রাসা বরগুনা থেকে ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা, বাগাতিপাড়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট নাটোর থেকে ৮৫ হাজার টাকা, উত্তর চরমানিকা লতিফীয়া দাখিল মাদ্রাসা ভোলা থেকে ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, মোহাব্বতপুর আমিনিয়া ফাজিল মাদ্রাসা জয়পুরহাট থেকে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকাসহ আরও অন্যান্য মাদ্রাসার শিক্ষকদের এমপিওভূক্তি বাতিল করার ভয়-ভীতি দেখিয়ে বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে সর্বমোট ৪ কোটি ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৭২ টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য আমরা পেয়েছি।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার এখানে যোগসাজশ রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন: আমরা সেরকম কোনো তথ্য পাইনি। তবে এখানে জুবায়ের ওরফে আসাদুজ্জামান মানিক মূলহোতা। তিনি আব্দুল গফফারকে নানা পরিচয়ে ব্যবহার করতেন।এই চক্রের সম্পর্কে জানা যায় ২০২৩ সালে। তবে তারা ২০১৯ সাল থেকে এধরণের অভিনব প্রতারণায় জড়িত।








