আসরের ফাইনালে আসা রেকর্ড পাঁচবারের ওয়ানডে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ভারতে শুরুতে ছিল নড়বড়ে। ফেভারিট তালিকায় অজিদের না রাখার কারণও অবশ্য ছিল না। সাউথ আফ্রিকা ও ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ হেরে বিশ্বকাপে আসা দলটিকে নিয়ে বাজি ধরার ঝুঁকিও ছিল।
হিসেব-নিকেশ ও জল্পনা-কল্পনার অবসান মাঠেই ঘটিয়েছে প্যাট কামিন্সের দল। উঠেছে ফাইনালের মঞ্চে। দলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, ম্যাথু হেড, অ্যাডাম জাম্পারা জ্বলে ওঠায় শিরোপা হয় থেকে একধাপ দূরে দাঁড়িয়ে ক্যাঙ্গারুবাহিনী।
লিগপর্বে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা অস্ট্রেলিয়া ষষ্ঠবারের মতো ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে মুখিয়ে আছে। রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর আড়াইটায় আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে হবে শেষের মহারণ। ভারতের বিপক্ষে মহারণের আগে জেনে নেয়া যাক দলটি কোন পথে হেঁটে এসেছে ফাইনালে।
ফাইনালের প্রতিপক্ষ ভারতের সঙ্গেই আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিক বোলারদের দাপটে ১৯৯ রানে গুটিয়ে যায়। সহজ লক্ষ্য তাড়ায় দুই রানে টপ অর্ডারের তিন ব্যাটার হারিয়ে ভারত বিপদে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুলের ১৬৫ রানের জুটির কাছে অজিরা মূলত ৬ উইকেটে হেরে বসে।
দ্বিতীয় ম্যাচে সাউথ আফ্রিকার কাছে ১৩৪ রানের শোচনীয় হারে অস্ট্রেলিয়ার সেমিতে ওঠার সম্ভাবনা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। আগে ব্যাট করা প্রোটিয়াদের ৭ উইকেটে ৩১১ রানের জবাবে ক্যাঙ্গারুরা ১৭৭ রানে গুটিয়ে যায়।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে লিগপর্বে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে এসে অজিদের মেলে জয়ের দেখা। আগে ব্যাট করা লঙ্কানরা ২০৯ রানে অলআউট হয়। জবাবে অস্ট্রেলিয়া ৮৮ বল হাতে রেখে ৫ উইকেটে জেতে। বল হাতে ৪ উইকেট নিয়ে অজিদের মুখ্য ভূমিকা রাখেন জাম্পা।
ডেভিড ওয়ার্নারের ১৬৩ ও মিচেল মার্শের ১২১ রানের আগ্রাসী ইনিংসে ভর করে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৯ উইকেটে ৩৬৭ রানের বিশাল সংগ্রহ তোলে কামিন্সবাহিনী। ব্যাট হাতে পাকিস্তান শুরুতে জবাবটা ভালো দিলেও পরে আর পেরে ওঠেনি, ৩০৫ রানে থামে। অজিরা পায় ৬২ রানের জয়।
আইসিসির সহযোগী সদস্য নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পরের ম্যাচে ছেলেখেলায় মাতে অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ৪০ বলে ম্যাক্সওয়েল করেন সেঞ্চুরি, গড়েন ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম শতকের রেকর্ড। ওয়ার্নারও পান সেঞ্চুরির দেখা। তাদের ৯ উইকেটে ৩৯৭ রানের জবাবে মাত্র ৯০ রানে থামে ডাচ দলটি। ৩০৯ রানের বিশাল ব্যবধানে জিতে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এবারের আসরে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ম্যাচগুলোর একটি ছিল নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার। আগে ব্যাট করে অলআউট হওয়ার আগে স্কোরবোর্ডে তারা তুলেছিল ৩৮৮ রান। ঝড়ো ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরি পাওয়া ট্রাভিস হেড খেলেন ১০৯ রানের ইনিংস।
কিউইরাও দিতে থাকে পাল্টা জবাব। রাচীন রবীন্দ্র ১১৬ রানের চমৎকার ইনিংস খেলেন। হাই-স্কোরিং ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে জয়ের একদম কাছে নিয়েছিলেন জিমি নিশাম। ৩৯ বলে ৫৮ রান করে নিশাম হন রানআউট। নাটকীয়তায় ভরা খেলায় ৫ রানের জয়ে সেমিফাইনালে খেলার পথ সহজ করে কামিন্সের দল।
পরের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৩ রানে জয়ের নায়ক ছিলেন জাম্পা। ব্যাট হাতে কার্যকরী ২৯ রানের ক্যামিও ইনিংস খেলার পর বল হাতে পান ৩ উইকেট। আগে ব্যাট করা অজিদের ২৮৬ রানের জবাবে ইংলিশরা ২৫৩ রানে অলআউট হয়।
বিশ্বকাপ তো বটেই, আফগানিস্তানের বিপক্ষে হয়তো ওয়ানডে ইতিহাসেরই সেরা ইনিংসটা খেলেছেন ম্যাক্সওয়েল। ওপেনার ইব্রাহিম জাদরানের ১২৯ রানে ভর করে আফগানরা ৫ উইকেটে ২৯১ রানের সংগ্রহ জমায়। পরে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ে ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের মুখে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। এরপর যা ঘটেছে, তা নিজের চোখকেই বিশ্বাস না করার মতো কিছু!
চোটে পড়া ম্যাক্সওয়েল অনেকটা এক পায়ের উপর নির্ভর করে ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়ার ৩ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয়ের নায়ক হন। প্যাট কামিন্স ১২ রানে অপরাজিত থাকলেও ম্যাক্সওয়েলকে যোগ্য সঙ্গ দিয়ে গড়েন ২০২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।
লিগপর্বে শেষ ম্যাচে অজিদের ৩০৭ রানের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে মিচেল মার্শের ১৭৭ রানের অপরাজিত ইনিংসের ৮ উইকেটের সহজ জয়ে সেমির প্রস্তুতি সেরে নেয় অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের তোপের মুখে সেমিতে খেই হারিয়ে ফেলে সাউথ আফ্রিকা। ২৪ রানে হারিয়ে বসে ৪ উইকেট। ডেভিড মিলারের ১০১ রানের ইনিংসে ভর করে পায় লড়াই করার পুঁজি। অলআউট হওয়ার আগে তোলে ২১২ রান। ওয়ার্নার-হেডের ৬০ রানের জুটিতে দুরন্ত সূচনার পরও চাপে পড়েছিল অজিরা, ১৩৭ রানে হারায় ৫ উইকেট।
প্রোটিয়াদের একের পর এক ক্যাচ মিসের মাশুল দিতে হয়। শেষদিকে দারুণ জমে ওঠা ম্যাচটি ৩ উইকেটে জিতে ফাইনালে পা রাখে অস্ট্রেলিয়া। ৬১ রানের ইনিংস খেলার পাশাপাশি বল হাতে ২ উইকেট পাওয়া হেড হন ম্যাচসেরা।








