কক্সবাজারে হাম রোগের সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলছে। চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসকরা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৯ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালসহ উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এতে হাসপাতালে চালু করা বিশেষ আইসোলেশন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীর সংখ্যা এখন ধারণ ক্ষমতার চারগুণের বেশি। আর আক্রান্তদের মধ্যে অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকায় স্বজনদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
এদিকে গত ২৪ ঘন্টায় জেলায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৬ জন। এ নিয়ে জেলায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত হাম উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৮৬৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাম অতিদ্রুত সংক্রমণশীল রোগ। সাম্প্রতিক সময়ে হাম দ্রুত বিস্তার লাভ করায় চিকিৎসকসহ স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সারাদেশে শিশুদের হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ায় দ্রুতসময়ে নিয়ন্ত্রণের আশা তাদের।
আড়াইশ শয্যা বিশিষ্ট কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ আইসোলেশন ইউনিট।
গতকাল দুপুরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, এ বিশেষ ইউনিটের সামনে শিশু রোগী, অভিভাবক ও স্বজনদের আনাগোনায় স্বাভাবিক হাঁটাচলা করাও কষ্টসাধ্য। তাদের কেউ দাঁড়িয়ে আছে আক্রান্ত শিশুকে ভর্তি করাতে, কেউ চিকিৎসাধীন শিশুর জন্য ঔষুধ ও খাবার দিতে আবার কেউ কেউ এসেছেন রোগীর খোঁজ-খবর নিতে। বিশেষায়িত ইউনিটের ভেতরেও গেছে দেখে একই দৃশ্যপট। বিশ শয্যা বিশিষ্ট ইউনিটটিতে চিকিৎসা নিচ্ছে ৬৮ জন। আর প্রতিদিন আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে আসায় এই সংখ্যা গড়ে ৮০ থেকে ৯০ জনে দাঁড়ায়। সিটের সংকুলান না হওয়ায় অধিকাংশকেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে মেঝেতে অবস্থান নিয়ে। এতে স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক ও জনবল নিয়ে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের।
কক্সবাজারের রামু থেকে নিজের সন্তানকে নিয়ে সদর হাসপাতালে আসেন রহিমা বেগম। তিনি বলেন, এখানে আসার পর আমার বাচ্চাটা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে গেছে।
মহেশখালীর শাপলাপুর থেকে আসা ফরিদুল আলম বলেছেন, ৪ দিন হল মেয়েকে নিয়ে এসেছি। এখনও ভালো কিছু দেখছি না।
চকরিয়া থেকে আসা রহিম উল্লাহ বলেন, আমার শিশু সন্তানকে নিয়ে আজ তিনদিন ধরে সদর হাসপাতালে। এখানে চিকিৎসকরা আমাদের কথা শোনে না। কি করবো-টাকা পয়সা নাই, বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারছি না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।
হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর অভিভাবক ও স্বজনরা বলছেন, জ্বর, সর্দি, কাশি, খিঁচুনি, র্যাশ, ব্যাথা ও খাবারের অরুচিসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়ায় সন্তানদের হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। কিন্তু হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি হওয়ায় তাদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। অনেকে ১০-১৫ দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থান করলেও রোগী এখনও সুস্থ হয়ে উঠেনি। আবার কারও কারও অবস্থা সংকটজনক পর্যায়ে থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রেরণ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে। প্রতিদিন ধারণ ক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা ও অব্যবস্থাপনারও অভিযোগ উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারে হামের প্রকোপ প্রকট আকার ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ৩৪ জন, ছাড়পত্র নিয়েছে ৩৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১১ মাস বয়সী উখিয়া উপজেলার রুহামণি নামের এক শিশুর। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬৮ জন। আর হামের প্রকোপ দেখা দেয়ার পর থেকে হাসপাতালটিতে মোট ভর্তি হয়েছে ৫৪৭ জন, ছাড়পত্র নিয়েছে ৪৭৯ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের।
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ বলেছেন, হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা। নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে না আসায় হাসপাতালে চালু করা হয়েছে বিশেষ আইসোলেশন ইউনিট। বর্তমানে ধারণ ক্ষমতার ৩-৪ গুণ বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। চিকিৎসকসহ স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে বিপুল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই কক্সবাজারে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এতে ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৫৩ জন কিন্তু জেলায় হামের ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয় ৩০ মার্চ থেকে। এতে গত ২৫ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৮১৬ জন। আর এই পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে জেলায় মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। যাদের মধ্যে ২২ বছর বয়সী একজন প্রাপ্ত বয়স্ক তরুণীও রয়েছে।
জেলার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন বলছেন, জেলায় হাম বিস্তারের পরিমান পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও এখনও নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে আসেনি। আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে চিকিৎসকসহ জনবল সংকটের বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ায় আগামী কিছুদিনের মধ্যে প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের আশা তার। আর হাম অতিদ্রুত সংক্রমিত রোগ হওয়ায় আক্রান্তদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
প্রধান পর্যটন নগরী হওয়ায় প্রতিদিন ছুটে আসা দেশের নানা প্রান্তের হাজারো পর্যটকের পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাসের কারণে হাম বিস্তারের ঝুঁকিতে রয়েছে কক্সবাজার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন রোহিঙ্গা শিশু হামের উপসর্গে আক্রান্ত হওয়ায় ছড়িয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।








