চ্যানেল আই অনলাইন
Advertisement
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

নূরজাহানের লাশ, দীক্ষাহীন শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের সামষ্টিক ময়নাতদন্ত

অধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকীঅধ্যাপক ডক্টর দিপু সিদ্দিকী
২:৫৯ অপরাহ্ণ ০৪, জুন ২০২৬
মতামত
A A
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে পঁচাত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচা-গলা লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি স্রেফ কোনো প্রাত্যহিক ক্রাইম রিপোর্টের খতিয়ান নয়। এটি মূলত আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক দেউলিাত্ব ও পচনের এক জীবন্ত ময়নাতদন্ত।

১ জুন রাতে ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ যখন মিরপুর-৬ নম্বরের সি ব্লকের সেই অন্ধকার, নোংরা কক্ষটিতে প্রবেশ করে, তখন সেখানে মানুষের একটি মৃতদেহ নয়, বরং সভ্যতার এক বীভৎস কঙ্কাল পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন অবহেলা, অনাহার আর চরম অমানবিক পরিবেশে পড়ে থাকার কারণে শরীরটিতে পচন ধরেছিল।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম এবং কুৎসিত অধ্যায়টি উন্মোচিত হয় যখন মৃতার সন্তানদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় সামনে আসে। নূরজাহান বেগম কোনো গৃহহীন, সনাথ বা অনাথ বৃদ্ধা ছিলেন না। তিনি সেই ফ্ল্যাটটিতে নিজের মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তাঁর অন্য সন্তানদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্ম সচিব (যাকে ইতিমধ্যে ওএসডি করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে), একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অপরজন কানাডাপ্রবাসী। সমাজের তথাকথিত ‘ক্রিম অব দ্য সোসাইটি’ বা সর্বোচ্চ স্তরের সফল, প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের জন্মদাত্রীর এই পরিণতি একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজকে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসা ও কাঠগড়ার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার গভীরতা কতটুকু? এটি কি সাময়িক হুজুগ, নাকি সমাজ পরিবর্তনের কোনো আন্তরিক তাগিদ—তা নিয়ে আজ নির্মোহ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, নূরজাহানের এই চলে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের খণ্ডচিত্র মাত্র।

আধুনিক শিক্ষার ভ্রান্তি: মেশিন বনাম মানবিক সত্ত্বা:

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এ আই) জোয়ারে ভাসছে। ডাটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, অ্যালগরিদম আর করপোরেট ম্যানেজমেন্টের মতো নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞানলাভের এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের চারপাশে। নতুন প্রযুক্তি আসছে, নিত্যনতুন আবিষ্কারের দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে—এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের, গর্বের এবং সময়ের দাবি। কিন্তু এই সব অগ্রগতির কেন্দ্রে যে উপাদানটি থাকার কথা ছিল, তা হলো ‘মানুষ’। মানুষের সেবায়, মানুষের আত্মিক কল্যাণে কীভাবে এই বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো হবে, সেই ‘মাত্রা জ্ঞান’ বা পরিমিতিবোধ মানুষকে কে দেয়? এই চেতনা কোনো ল্যাবরেটরি বা কোডিং ক্লাসরুম থেকে আসে না; এটি আসে কলা (আর্টস), সাহিত্য, ইতিহাস এবং সামাজিক দর্শন বিষয়ক চর্চা থেকে।

Reneta

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা দর্শন শিক্ষাকে চরম অবজ্ঞার চোখে দেখছে। যে শিক্ষা সরাসরি কোনো আর্থিক ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’ বা করপোরেট মুনাফা এনে দেয় না, তাকে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ‘অনুৎপাদনশীল’ বা অপ্রয়োজনীয় তকমা দিয়ে পাঠ্যক্রমের প্রান্তসীমায় ঠেলে দিয়েছেন। আজকের শিক্ষাব্যবস্থা জিপিএ-৫, গোল্ডেন মেডেল আর লোভনীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্যারিয়ারের পেছনে এক অন্ধ ইঁদুরদৌড় তৈরি করেছে। আমরা সন্তানদের মুখস্থ বিদ্যা গিলিয়ে মেধার সার্টিফিকেট দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তাদের ভেতরের মানবিক সত্ত্বাকে সুকৌশলে হত্যা করছি।

বিজ্ঞানমনস্কতা বা আধুনিক কারিগরি দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি, কিন্তু একজন বিজ্ঞানী বা প্রযুক্তিবিদের চিন্তায় যদি মানবিক বিজ্ঞান ও দর্শনের স্পর্শ না থাকে, তবে তার ভেতরের সহানুভূতি ও আবেগ মরে যেতে বাধ্য। দর্শনহীন বিজ্ঞান আর মূল্যবোধহীন উচ্চশিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না, বরং তাকে পরিণত করে এক-একটি দক্ষ, সংবেদনহীন, স্বার্থপর রোবটে। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা সেই যান্ত্রিক শিক্ষারই একেকটি চূড়ান্ত প্রোডাক্ট। তারা বুয়েটে পড়াতে পারেন, সরকারের নীতি নির্ধারণ করতে পারেন, ক্লাসরুমে শিশুদের পাঠ দিতে পারেন—কিন্তু মায়ের জীর্ণ ঘরের খবর রাখার, অসুস্থ জন্মদাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিক বোধটুকু তাদের ভেতর গড়ে ওঠেনি। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের ‘সফল’ হতে শিখিয়েছে, ‘মানুষ’ হতে শেখায়নি।

ভোগবাদী সমাজ ও করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় সম্পর্ক:

এই সংকটের শেকড় আরও গভীরে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে। বর্তমান বিশ্বায়িত ও নব্য-উদারবাদী অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বার্থ আর চরম ভোগবাদের (কনজ্যুমারিসম) ওপর। আমাদের সনাতন যৌথ পরিবারের সুরক্ষামূলক ও আবেগীয় কাঠামো ভেঙে আমরা এখন ‘আমি, আমার সঙ্গী আর আমার চার দেয়াল’—এই আত্মকেন্দ্রিক অণু-পরিবার (নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি) সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় রক্ত ও আবেগের সম্পর্কগুলোও এখন লাভ-ক্ষতির করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়।

মা-বাবা যখন বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন এই স্বার্থপর সন্তানদের কাছে তাঁরা কোনো পরম শ্রদ্ধেয় বা আবেগের আশ্রয় থাকেন না; বরং তাঁরা গণ্য হন এক প্রকার ‘অনুৎপাদনশীল অর্থনৈতিক বোঝা’ (নন প্রোডাক্টিভ বার্ডেন) হিসেবে। উৎসব-পার্বণে, এমনকি পবিত্র ঈদের দিনেও যে সন্তানদের মনে মায়ের একাকীত্ব ঘোচানোর বা তাঁর হাতটি একটু ছুঁয়ে দেখার টান জাগে না, তারা কাঠামোগতভাবে মানুষ হলেও আত্মিকভাবে পশুর চেয়েও অধম।

সমাজে একটি প্রচলিত ও সরলীকৃত ধারণা আছে যে, কেবল অশিক্ষা, অজ্ঞতা বা দারিদ্র্যই অপরাধ ও নৈতিক স্খলনের জন্ম দেয়। কিন্তু সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষিত ও গবেষণা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে। আজ সমাজের সবচেয়ে বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুটপাট, অর্থ পাচার, পরিবেশ ধ্বংস এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পেছনে কিন্তু কোনো নিরক্ষর বা দরিদ্র মানুষ নেই। এর পেছনে রয়েছে টাই-কোট পরা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, উচ্চশিক্ষিত ও সুবিধাভোগী শ্রেণী। তারা আইন জানে, তাই আইন ফাঁকি দিতেও ওস্তাদ। মায়ের প্রতি এই চরম নিষ্ঠুরতা আসলে সেই বৃহত্তর সামাজিক ও মানসিক পচনেরই একটি অংশ। যে ব্যক্তি নিজের জন্মদাত্রীকে এমন অবহেলায় তিলে তিলে মরতে দিতে পারে, সে রাষ্ট্রের আমানত রক্ষা করবে কিংবা দেশের সম্পদ লুট করতে দ্বিধা করবে না—তা ভাবা চরম বোকামি।

এই ঘটনার সবচেয়ে বিপজ্জনক ও আশঙ্কাজনক দিক হলো, সন্তানদের একজন আবার পেশায় শিক্ষিকা। যিনি নিজে মায়ের খোঁজ নেন না, ঘরের নোংরা পরিষ্কারের ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিশুদের কী নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পাঠ দেবেন? শিক্ষকেরাই যদি মানসিকভাবে এভাবে স্খলিত ও পচে যান, তবে আগামীর প্রজন্ম যে আরও ভয়াবহ এবং ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ড. সুকোমল বড়ুয়ার দর্শন এবং বাস্তবায়নের শূন্যতা:

মানবিক দর্শন এবং বিজ্ঞানের একটি সুসমন্বিত রূপ ধারণ করে সমাজকে এই অবক্ষয় থেকে বাঁচানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে, সভা-সেমিনারে এবং তাত্ত্বিক ময়দানে লড়াই করে যাচ্ছেন প্রখ্যাত বৌদ্ধতত্ত্ববিদ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর সুকোমল বড়ুয়া। তিনি তাঁর একাধিক বক্তব্যে, গবেষণায় এবং জাতীয় সংলাপে অত্যন্ত জোরালোভাবে একটি বিষয় তুলে ধরেছেন—তা হলো শিক্ষার আত্মিক রূপান্তর। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে কেবল বস্তুগত ও কারিগরি শিক্ষা মানুষকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং সেই নৈতিক মহামারি থেকে বাঁচতে হলে কেন আমাদের পাঠ্যক্রমে অহিংসা, পারস্পরিক মৈত্রী এবং অসাম্প্রদায়িক সামাজিক দর্শনের মেলবন্ধন প্রয়োজন।

আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফোরামে ড. সুকোমল বড়ুয়ার এই দূরদর্শী ও গভীর চিন্তাধারাকে সাধুবাদ জানাতে দেখেছি। গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের খণ্ডিতাংশ, কলাম বা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়, সুধীসমাজে তা নিয়ে মৃদু আলোচনাও হয়। কিন্তু মূল প্রশ্নটি এখানে—এই তত্ত্ব, এই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব আসলে কার?

আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক মহল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিকুলাম বোর্ড (এনসিটিবি) কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মতো বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো যে এই মনিষী ও শিক্ষাবিদদের দীর্ঘদিনের সুচিন্তিত পরামর্শকে বিন্দুমাত্র আমলে নেয়নি, নূরজাহান বেগমের এই করুণ মৃত্যুই তার সবচেয়ে বড় ও অকাট্য প্রমাণ। ড. সুকোমল বড়ুয়ার মতো মনীষীদের প্রস্তাবিত ‘মানবিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের সমন্বিত শিক্ষা মডেল’ যদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা যেত, তবে আজ হয়তো আমাদের চারপাশের সমাজটা এমন শ্মশান হতো না। আমরা পেতাম নৈতিকতাসমৃদ্ধ, সংবেদনশীল একঝাঁক প্রকৃত মানুষ, কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো ‘উচ্চশিক্ষিত অমানুষ’ নয়।

উত্তরণের পথ: আইন বনাম মনস্তাত্ত্বিক সংস্কার:

এই সামাজিক মড়ক থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই সংকটের সমাধান কেবল একতরফা আইনি প্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দ্বি-মুখী নীতি:

সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট উত্তরণ:

 ১. আইনের কঠোর প্রয়োগ:

বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ রয়েছে, যেখানে সন্তানদের জন্য বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার দেখাশোনা ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটি একটি ভালো আইন হলেও সচেতনতার অভাব, সামাজিক লোকলজ্জা এবং আইনি জটিলতার কারণে এর প্রয়োগ ও কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত। এই আইনের ধারাগুলো আরও কঠোর, গতিশীল ও স্বতঃস্ফূর্ত করা সময়ের দাবি। মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের চাকরি, পদোন্নতি, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বা সামাজিক কোনো মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করার মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান সংবিধানে যুক্ত করতে হবে। যখন একজন উচ্চপদস্থ আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা চিকিৎসক জানবেন যে মায়ের অবহেলার কারণে তাঁর এত কষ্টের ক্যারিয়ার, সামাজিক অবস্থান ও ক্ষমতা এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, তখন ভয়ের কারণে হলেও তাঁরা জন্মদাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হবেন।

 ২. পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংস্কার:

আইন দিয়ে হয়তো রাষ্ট্র কাউকে শারীরিকভাবে মা-বাবার পাশে দাঁড় করাতে পারবে, কিন্তু মনের ভেতরের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বা সহানুভূতি জোর করে তৈরি করতে পারবে না। সেটার জন্য প্রয়োজন আমাদের পারিবারিক ও শিক্ষাগত মনস্তত্ত্বের আমূল সংস্কার। শৈশব থেকেই সন্তানকে শেখাতে হবে যে মা-বাবা কোনো ‘আর্থিক বিনিয়োগ’ (ফিন্যানশিয়াল ইনভেস্টমেন্ট) নন যে বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের থেকে লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড খুঁজতে হবে। মা-বাবা হলেন পরিবারের সবচেয়ে সম্মানিত, পবিত্র এবং আবেগের অংশ।

একই সাথে, অভিভাবকদেরও সন্তানের লালন-পালনের ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। সন্তানদের শুধু ‘টাকা বানানোর যন্ত্র’ বা ‘জিপিএ-৫ পাওয়ার মাধ্যম’ হিসেবে বড় করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সমাজে চলছে, তা বন্ধ করতে হবে। সন্তানের সাথে মানবিক ও আবেগীয় বন্ধন দৃঢ় করতে হবে, যেন তারা সফল হওয়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল ও সহনশীল মানুষ হতে শেখে।

মিরপুরের সেই চার দেয়ালের ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়া মায়ের পচা-গলা লাশের গন্ধ আসলে শুধু নির্দিষ্ট একটি আবাসন এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়; এই তীব্র গন্ধ আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থার, আমাদের ঘুণে ধরা শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের পচনের গন্ধ। আইন যদি বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করে অপরাধের সংখ্যা কমায়, তবে পারিবারিক মূল্যবোধ ও দর্শন ভেতর থেকে মানুষকে আলোড়িত করে প্রকৃত মানুষ বানায়। যতক্ষণ না রাষ্ট্র ও পাঠ্যক্রমে এই দুইয়ের সঠিক সমন্বয় ঘটছে, ততক্ষণ শিক্ষার কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে এমন রোবট ও অমানুষ তৈরি হওয়া বন্ধ হবে না।

আজ সমাজে দুর্নীতি আর অসাম্য যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তার পরেও যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন করে একটি দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন তৈরি করা না যায়, তবে এই নূরজাহানের তালিকায় যুক্ত হবে আরও লক্ষ লক্ষ নাম। সময় এসেছে চোখ খোলার, রাষ্ট্রীয় ঘুম ভাঙার। সন্তানদের শুধু পিএইচডি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আমলা বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে। নয়তো আজ যে অবহেলা আর নির্মমতার শিকার এই মা হলেন, কাল সেই একই ভয়াবহ নিয়তি আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে কড়া নাড়বে।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Channel-i-Tv-Live-Motiom

Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: দীক্ষাহীন শিক্ষাব্যবস্থানূরজাহানের লাশসামষ্টিক ময়নাতদন্ত
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

নূরজাহানের লাশ, দীক্ষাহীন শিক্ষাব্যবস্থা ও আমাদের সামষ্টিক ময়নাতদন্ত

জুন ৪, ২০২৬

১০ বছর একক নাটকে তৌসিফ-স্পর্শিয়া

জুন ৪, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

হাজিদের ১৫০ লাগেজে চুরির অভিযোগ ভিত্তিহীন: বিমান প্রতিমন্ত্রী

জুন ৪, ২০২৬

সিটি নির্বাচনে লড়বেন সেলিনা হায়াৎ আইভী

জুন ৪, ২০২৬

শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা ৭ জুন

জুন ৪, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: জাহিদ নেওয়াজ খান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In
Bkash Stickey January 2026 Bkash Stickey September 2025 Desktop

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT