ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরা শহরে ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে ৩২ ঘণ্টা আটকে থাকার পর ১৮ দিনের এক নবজাতককে বুকে জড়িয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন মা দায়ানা পাতিনো। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার ছোট্ট ছেলে হুয়ান দাভিদ তাকে বেঁচে থাকার প্রবল অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।
সোমবার ২৯ জুন সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
ভেনিজুয়েলায় নিজের বিধ্বস্ত বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৮ দিন বয়সী শিশুসহ উদ্ধার হওয়ার পর দায়ানা পাতিনো জানান, তার ছেলে হুয়ান ডেভিড তাকে “জেগে থাকার ও সতর্ক থাকার প্রেরণা” জুগিয়েছে।
তিনি বলেন, “আমার সন্তান বেঁচে ছিল বলেই আমিও বেঁচে ছিলাম। আমি বারবার ওর নাক স্পর্শ করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছিলাম, সে এখনো শ্বাস নিচ্ছে কি না।”
‘অবিশ্বাস্যভাবে মা ও নবজাতক উদ্ধার
রোববার রাজধানী কারাকাসের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দাইয়ানা জানান, ভূমিকম্পের সময় তিনি উত্তর উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়ারায় নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টের অষ্টম তলায় থালা-বাসন পরিস্কার করছিলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, এটি সামান্য কম্পন। তাই দ্রুত ১৮ দিনের শিশুপুত্রকে কোলে তুলে নেন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ভবন ধসে পড়ে।
তিনি বলেন, “মনে হচ্ছিল আমি আকাশে উড়ে যাচ্ছি। এরপর মনে হলো কাদা আর মাটির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি। তারপর একটি গর্তে পড়ে যাই। কীভাবে যে সন্তানকে হাত থেকে ছাড়িনি, আজও বুঝতে পারি না। আমি আসবাবপত্রের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিলাম।”
তিনি বলেন, “ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে প্রথমে চিৎকার করছিলাম। পরে বুঝতে পারলাম, কেউ শুনতে পাচ্ছে না। তখন নিজেকে বললাম, শক্তি নষ্ট করব না। যখন মানুষের কণ্ঠ বা পায়ের শব্দ শুনব, তখনই চিৎকার করব।”
তিনি জানান, তার বাম পা কংক্রিটের নিচে আটকে গিয়েছিল। মাথার এক পাশ পাথরের সঙ্গে চেপে ছিল। নড়াচড়ারও উপায় ছিল না।
তিনি জানান, চারপাশে ঘন অন্ধকারের মধ্যেও ছোট্ট একটি আলোর বিন্দু দেখতে পাচ্ছিলেন, যা তার কাছে চাঁদের মতো মনে হয়েছিল।
উদ্ধারের শেষ মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “হঠাৎ আমার ভাইয়ের কণ্ঠে নিজের নাম শুনতে পাই। নিজেকে বললাম, এটাই আমার শেষ সুযোগ। সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললাম—‘আমি এখানে।’ তখন ভাই বলল, ‘আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। তোমাকে উদ্ধার না করে আমি এখান থেকে যাব না। আমার ভাই তার সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন।”
এরপর দীর্ঘ ও সতর্ক উদ্ধার অভিযানের পর বৃহস্পতিবার রাতে মা ও শিশুকে জীবিত বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা।
ভূমিকম্পে দাইয়ানার দুই পায়ে গুরুতর আঘাত লাগলেও শিশু হুয়ান ডেভিড সামান্য আঘাত পেয়েছিল।
এদিকে, দাইয়ানার স্বামী গেরসন ভূমিকম্পের ঠিক আগে গাড়ি নিয়ে বাসায় ফিরেছিলেন। গাড়ি পার্ক করার পর কম্পন শুরু হলে তিনি একটি দেয়াল টপকে প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু নিজের অ্যাপার্টমেন্ট ধসে পড়া দেখে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, স্ত্রী ও সন্তান আর বেঁচে নেই।
তিনি বলেন, “ওদের জীবিত উদ্ধার হওয়া ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। আমি ভেবেছিলাম তারা মারা গেছে। ছেলেকে যখন কোলে পেলাম, মনে হলো যেন নতুন করে জন্ম নিলাম। মনে হচ্ছিল আমার জীবন আবার ফিরে এসেছে।”
উদ্ধারের সেই ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, আবেগে আপ্লুত গেরসন আকাশের দিকে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন।
নতুন করে শুরু করার প্রত্যয়
ভূমিকম্পে তাদের বাড়িঘর ও প্রায় সব সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে পরিবারের পোষা কুকুরটিও। তবু ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী এই দম্পতি।
গেরসন বলেন, “আমরা প্রায় সবকিছু হারিয়েছি। কিন্তু আমরা বেঁচে আছি। এখান থেকেই আবার নতুন করে শুরু করব। হারানো সবকিছু একদিন আবার গড়ে তুলব।
গত বুধবার (২৪ জুন) ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট এটিকে ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের “সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ” বলে উল্লেখ করেছেন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও ধ্বংসস্তূপে আরও জীবিত মানুষ পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।







