বাংলাদেশের প্রতিকৃতি বা আলোকচিত্রের ইতিহাস লিখতে গেলে যে নামটি সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তিনি নাসির আলী মামুন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যামেরার লেন্সে তিনি শুধু মানুষের ছবি তোলেননি, ধরে রেখেছেন সময়, ইতিহাস এবং একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের দলিল।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই কিংবদন্তী আলোকচিত্রীকে ঘিরে নানা অজানা গল্প, স্মৃতি ও সংগ্রামের কথা।
শৈশবেই শুরু হয়েছিল তার এই যাত্রা। মাত্র নয়-দশ বছর বয়সে সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিখ্যাত মানুষদের ছবি কেটে সংগ্রহ করতেন তিনি। সেই নেশার কারণে বাবার বকুনিও কম খেতে হয়নি। কিন্তু সেই শিশুসুলভ মুগ্ধতাই একদিন তাকে নিয়ে যায় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রী হওয়ার পথে।

কৈশোরে তিনি একটি বিষয় লক্ষ্য করেন- বাস্তবে যেসব মানুষকে দেখতেন, ছবিতে তাদের অনেককেই চিনে নেওয়া যেত না। সে সময় স্টুডিওভিত্তিক আলোকচিত্রে অতিরিক্ত রিটাচিং ছিল সাধারণ বিষয়। নেগেটিভ ঘষে মুখের দাগ মুছে দেওয়া কিংবা বিভিন্ন উপায়ে চেহারা বদলে দেওয়ার প্রচলন ছিল। এই কৃত্রিমতা মেনে নিতে পারেননি নাসির আলী মামুন।
১৯৭১ সালে ঢাকার গ্রিন রোডের একটি স্টুডিও থেকে ধার করা ক্যামেরা হাতে শুরু হয় তার আলোকচিত্রের পথচলা। শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল মানুষকে যেমন, তেমনভাবেই তুলে ধরা।

তার ভাষায়, তিনি প্রতিকৃতি বা আলোকচিত্রকে সাজানো ও কৃত্রিমতার জায়গা থেকে সরিয়ে বাস্তব ও সৎ উপস্থাপনার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
ক্যারিয়ারের শুরুতে সাদা-কালো ফিল্মই ছিল তার প্রধান মাধ্যম। পরে রঙিন প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেও তিনি কালো-সাদা আলোকচিত্রের প্রতিই অনুরক্ত থেকে যান। তার বিশ্বাস, সাদা-কালোর ভেতরেই রয়েছে গভীরতম আবেগ ও শিল্পিত প্রকাশের সুযোগ।
এই সততা ও নান্দনিকতার কারণেই তিনি হয়ে ওঠেন কবি-সাহিত্যিকদেরও প্রিয় মানুষ। কবি শামসুর রাহমান তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ক্যামেরার কবি’ হিসেবে। নীরেন্দ্রনাথ, গুণ ও আল মাহমুদের মতো কবিরাও তাকে নিয়ে লিখেছেন কবিতা।

বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে তার ক্যামেরা পৌঁছেছে বিশ্বের বহু খ্যাতিমান মানুষের কাছে। জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস, কিংবদন্তী বক্সার মুহাম্মদ আলী, মানবতাবাদী মাদার তেরেসা, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং, লেখক পাওলো কোয়েলহোসহ অসংখ্য বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বকে তিনি ক্যামেরাবন্দি করেছেন।
শুধু ছবি নয়, তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার অডিও ও ভিডিও সাক্ষাৎকারও সংরক্ষণ করেছেন তিনি, যার বড় একটি অংশ এখনো অপ্রকাশিত।
দীর্ঘ কর্মজীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। ২০১৭ সালে চবি মেলা লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড, ২০১৮ সালে শিল্পকলা পদক, ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ এবং ২০২৫ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন তিনি।
তবে নাসির আলী মামুনের কাছে পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা এবং তার দীর্ঘ আলোকযাত্রার স্মৃতিগুলো।

বর্তমানে সত্তরের কোঠায় থাকা এই আলোকচিত্রী নিজের বিশাল আর্কাইভ সংরক্ষণ নিয়েই বেশি ভাবছেন। তার স্বপ্ন একটি ‘ফটোজিয়াম’ বা আলোকচিত্র জাদুঘর, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো দেখতে পারবে।
তরুণ শিল্পীদের উদ্দেশে তার পরামর্শও ব্যতিক্রমী। তিনি মনে করেন, জীবনের সাধারণ ও দৈনন্দিন বিষয়গুলোর মধ্যেই অসাধারণ শিল্প লুকিয়ে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে সেই সাধারণকে নথিবদ্ধ করতে পারলেই সৃষ্টি হয় অনন্য শিল্প।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে নাসির আলী মামুন যা করে চলেছেন, তা শুধু আলোকচিত্র নয়; বরং একটি জাতির স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করার এক নিরলস প্রয়াস। তার প্রতিটি ফ্রেম যেন সময়ের সাক্ষ্য, আর প্রতিটি প্রতিকৃতি একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার







