আমার ছেলেবেলার সরস্বতী পূজার আনন্দ ছিল সত্যিই অপরিসীম। সে আনন্দ কেবল একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা শুরু হতো পূজার প্রায় এক মাস আগেই। আমাদের বাজারের বারোয়ারী মন্দিরে তখন থেকেই চলত প্রস্তুতির ব্যস্ততা। হাটে-বাজারে, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পূজার নিমন্ত্রণ করা আর চাঁদা তোলা ছিল প্রথম কাজ। তারপর পুরোহিত ঠিক করা, প্রতিমা বায়না—সব মিলিয়ে যেন ধীরে ধীরে একটি বড় উৎসবের রূপরেখা আঁকা হচ্ছিল।
পূজার তিন-চার দিন আগে থেকেই এলাকায় সাজ সাজ রব পড়ে যেত। দাদারা শহর থেকে মাইক ঠিক করে আনতেন। পূজার আগের দিন বিকেলে মাইক আর প্রতিমা এসে পৌঁছাত। বাঁশে মাইক ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। মাইকে বাজত পুরোনো দিনের নরম বাংলা গান, মাঝে মাঝে দু’একটি হিন্দি গানও। বড়দাদাদের সঙ্গে গেট সাজানো, মন্দিরের সামনে সামিয়ানা টানানো, আলো লাগানো-এইসব কাজে কখন যে রাত গভীর হয়ে যেত, টেরই পাওয়া যেত না।
সব কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত একটা বেজে যেত। শীতের রাতে গলা ভাঙা তখন প্রায় নিশ্চিত। মা বারবার সাবধান করতেন—“ঠান্ডা লাগাস না।”
মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকে দেখতাম, বাবা মিষ্টি দই পাতচ্ছেন। ফুটন্ত দুধে চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে গাঢ় লাল করে, ঠান্ডা হলে তাতে বীজ দই মিশিয়ে মাটির ভাঁড়ে ঢালা হতো। তারপর কাঁথা, কম্বল আর চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে অন্ধকার জায়গায় রেখে দেওয়া—সকালে জমাট বাঁধা দইয়ের অপেক্ষা। পূজার আগে মা চিঁড়ার মোয়া, মুড়ির মোয়া বানাতেন আর খই মাখাতেন—ঘরের ভেতর তখন উৎসবের গন্ধ।
পূজার দিন ভোরেই মা ঘুম থেকে ডেকে দিতেন ফুল, বেলপাতা, দূর্বা, কলাপাতা আর আম্রপল্লব সংগ্রহ করতে। সব জোগাড়ের পর দিদিরা আমাদের নিয়ে যেত নদীর ঘাটে স্নান করাতে। মাঘের শীতের সকালে নতুন কসকো সাবানের প্যাকেট খুললেই যে তীব্র অথচ মধুর গন্ধ বেরোত, তা আজও স্মৃতিতে লেগে আছে। বাড়ি থেকে জল গরম করে আনা হতো—সেই উষ্ণ জলের ছিটা শীতল শরীরে পড়লে এক অদ্ভুত আরাম লাগত। স্নান শেষে সাদা পাঞ্জাবি পরে সোজা মন্দিরে যাওয়া।
মন্দিরে পৌঁছে দিদি-দাদাদের সঙ্গে পূজার কাজে যোগ দিতাম। সকাল সাড়ে দশটা বা এগারোটার মধ্যে ঠাকুরমশাই এসে যেতেন। মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে একটাই প্রার্থনা জাগত—সামনের পরীক্ষায় ভালো ফল করার আকাঙ্ক্ষা। দেখতে দেখতে দেবীর চক্ষুদান ও পূজা সম্পন্ন হতো। পুষ্পাঞ্জলির সময় আমরা জোড় হাতে ফুল আর বেলপাতা নিয়ে উচ্চারণ করতাম—
“নমো সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে।
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে॥”
এরপর—
“জয় জয় দেবী চরাচর সারে,
কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে।
বীণারঞ্জিত পুস্তক হস্তে,
ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে॥”
পুষ্পাঞ্জলি শেষে ভক্তিভরে দেবীর চরণে ফুল ও বেলপাতা অর্পণ করা হতো। অতঃপর হোমের মাধ্যমে পূজা সমাপ্ত হতো। হোম শেষে মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে বিদায়—আগামী বছর আবার আসার প্রত্যাশায়।
পূজান্তে বাড়ি ফিরে দেখতাম, মা আস্ত ইলিশ মাছ, লাউয়ের ডগা আর আস্ত বেগুন কুলায় করে সিঁদুর দিয়ে পূজোর ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। মাছ কাটার পর মাছের আঁশ রাখা হতো বিশেষ এক খুঁটির(বাস্ত খাম) গোড়ায়—বিশ্বাস ছিল, এতে সংসারে ভবিষ্যতের বিয়ের খরচের টাকা জমে। পরে সেই ইলিশ মাছ আর লাউ দিয়ে শুধু জিরা ফোড়ন ও কাঁচা মরিচে রান্না, আর মাছের কাঁটা দিয়ে লাউয়ের ঘণ্টো। সেই খাবারের স্বাদ ছিল অমৃতসম। পূজার প্রসাদসহ মায়ের হাতের রান্না আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত—সে তৃপ্তি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আগেকার দিনে সরস্বতী পূজার দিন থেকেই ইলিশ খাওয়ার রীতি শুরু হতো।
বিকেলে শুরু হতো বাড়ি বাড়ি ঘোরা। কোথাও লুচি ও সুজি, কোথাও দই, মুড়ির মোয়া মাখা—সবই আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতাম। সন্ধ্যার আরতিতে মন্দির প্রাঙ্গণ ভরে উঠত অনাবিল উৎসবে। গান, ধুপতি নৃত্য আর ঢাকের তালে চারদিক মুখর হয়ে উঠত। সব আনন্দ শেষে রাত এগারোটার দিকে মা বা বড়দিদিদের ধাক্কায় অবশেষে বাড়ি ফেরা।
পরের দিন ছিল খিচুড়ি উৎসব। সব বাড়ি ঘুরে চাল, ডাল, তেল, নুন আর আনাজপাতি সংগ্রহ করা হতো। সন্ধ্যায় শুরু হতো পাতলা খিচুড়ি রান্না। বেশির ভাগ জিনিসই জুটে যেত, সামান্য কিছু কিনতে হতো। রান্না শেষে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা পাতলা খিচুড়ি—আহা, সে স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।
পূজোর তৃতীয় দিনে চিনি-বাতাসা প্যাকেট করে বাড়ি দিয়ে আসার রীতিও ছিল আমাদের। এই সব ছোট ছোট রীতি আর স্মৃতির মধ্যেই গাঁথা ছিল আমাদের সরস্বতী পূজার দিনগুলো—যা আজও মনে পড়লে মন ভরে যায় এক গভীর, মধুর নস্টালজিয়ায়।










