ইন্দোনেশিয়ায় সরকারি পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ খেয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই ১ হাজারের বেশি স্কুলশিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দেশটির পশ্চিম জাভার চিপংকর এলাকায় সর্বশেষ ১ হজার ১৭১ জন শিশুর অসুস্থতার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এই ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নেতৃত্বে চালু হওয়া বিলিয়ন ডলারের “ফ্রি স্কুল মিল কর্মসূচি” নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে, একই ধরনের বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে পশ্চিম জাভা ও মধ্য সুলাওয়েসি প্রদেশে যেখানে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়।
বিভিন্ন এনজিও ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কর্মসূচিটি সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে পূর্ণ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী মুহাইমিন ইস্কান্দার জানিয়েছেন, এ কর্মসূচি বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
চিকিৎসকদের বরাতে জানা যায়, আক্রান্তদের মধ্যে পেটব্যথা, মাথা ঘোরা, বমি ও শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা গেছে। সাধারণত খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শ্বাসকষ্ট দেখা যায় না, ফলে এটি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
চিপংকর অঞ্চলে শিশুরা যে খাবার খেয়েছে, তাতে ছিল সয়া সস দিয়ে রান্না করা মুরগি, ভাজা তোফু, সবজি ও ফল। আগের কিছু ঘটনায় মেয়াদোত্তীর্ণ সস এবং এমনকি ভাজা হাঙরের মাংস খাওয়ানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পুষ্টি সংস্থা (ন্যাশনাল নিউট্রেশন এজেন্সি) জানিয়েছে, চিপংকর অঞ্চলের পুষ্টি সরবরাহ ইউনিট (এসপিপিজি) এর কারিগরি ত্রুটির কারণেই বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ওই ইউনিটের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
পশ্চিম বান্ডুং অঞ্চলের প্রশাসক জেজে রিচি ইসমাইল একে ‘ব্যতিক্রমী ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন, যাতে দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
জাতীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিজিএন) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ হাজার ৭১১টি বিষক্রিয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই জাভা দ্বীপে। তবে ইন্দোনেশিয়ান এডুকেশন মনিটরিং নেটওয়ার্ক (জেপিপিআই) জানিয়েছে, তাদের হিসেবে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৫২ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
জেপিপিআই-এর জাতীয় সমন্বয়কারী উবাইদ মাতরাজি বলেন, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সরকারকে ‘আউটব্রেক’ ঘোষণা ও কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করে পূর্ণ তদন্তে বাধ্য করার মতো।
কিছু মহল প্রস্তাব করেছে, সরকারের বরাদ্দকৃত অর্থ অভিভাবকদের হাতে দেওয়া হোক, যাতে তারা নিজেরা সন্তানের জন্য খাবার প্রস্তুত করতে পারেন। তবে এই প্রস্তাব আগেই নাকচ করেছে সরকার।
বিশ্বব্যাপী স্কুল মিল কর্মসূচিগুলো শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও উপস্থিতি বৃদ্ধিতে কার্যকর প্রমাণিত হলেও, ইন্দোনেশিয়ার ২৮ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কর্মসূচির একটি।
২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও এই কর্মসূচিকে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেন, যার লক্ষ্য ছিল অপুষ্টিজনিত ‘স্টান্টিং’ সমস্যা দূর করা যা দেশটির ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ২০ শতাংশকে প্রভাবিত করে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই কর্মসূচিসহ নতুন ঘর নির্মাণ ও বিনামূল্যে চিকিৎসা পরীক্ষার মতো বিভিন্ন জনবান্ধব উদ্যোগের কারণে প্রাবোওর জনপ্রিয়তা বাড়ে। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মাথায় তার অনুমোদন রেট দাঁড়ায় ৮০ শতাংশ।
২০২৫ সালে সরকারের বাজেটে কর্মসূচিটির জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১০ বিলিয়ন ডলার যেখানে ভারত মাত্র ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১২ কোটি শিক্ষার্থীকে খাবার দেয়।
এ নিয়ে দুর্নীতির শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন জাতীয় নিরীক্ষা বোর্ডের বিশ্লেষক মোহাম্মদ রাফি বাকরি। তিনি বলেন, এমন বৃহৎ বাজেটের প্রোগ্রাম দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তাদের জন্য সোনার খনি হয়ে উঠতে পারে।








