বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লিচুর রাজধানীখ্যাত দিনাজপুরে এবার লিচুর ফলনে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আগের তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কম লিচু ধরেছে গাছে। যেটুকু লিচু আছে, পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছেই ফেটে যাচ্ছে।
তীব্র তাপদাহ, অসময়ে ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে বাগানে লিচুর ফলনে বিপর্যয় ঘটছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ফলে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন লিচু চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে দিনাজপুরের রসালো লিচুর দেশজুড়ে সুখ্যাতি থাকায় এবার মৌসুমের শুরুতেই অপরিপক্ব ও স্বাদহীন লিচুতে সয়লাব হয়েছে বাজার। গাছে লিচু নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ও বেশি লাভের আশায় বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে কাঁচা ও টক লিচু পেড়ে বাজারে বিক্রি করছেন। এসব অপরিপক্ব লিচু খেয়ে শিশুদের বমি, পেটে ব্যথা ও খিঁচুনিসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।
দিনাজপুরের ১৩ উপজেলায় ৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। এছাড়াও বসতবাড়িতে ৭৮০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে সাড়ে ৫ হাজার বাগানে গাছের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ২১ হাজারেরও বেশি।
দিনাজপুরের বেদানা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না থ্রি, চায়না ফোর ও কাঠালি লিচুর খ্যাতি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রয়েছে। এবার লিচু গাছে মুকুল ভালো এলেও তীব্র তাপদাহ, অসময়ের বৃষ্টি, ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বাগানের অধিকাংশ মুকুল ও গুটি নষ্ট হয়ে যায়। তীব্র তাপদাহ ও প্রচণ্ড গরমে লিচু পরিপক্ব হওয়ার আগেই ফেটে যাচ্ছে, শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। এতে আগের তুলনায় এ বছর লিচুর ফলন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
দিনাজপুর জেলায় লিচুর রাজধানীখ্যাত মাসিমপুর এলাকার লিচু বাগান মালিক মিনারুল ইসলাম জানান, “যেটুকু লিচু আছে, পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছেই ফেটে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অসময়ে ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে বাগানে লিচুর ফলনে বিপর্যয় ঘটছে। মহা সমস্যায় পড়েছি আমরা। বাইরের ব্যবসায়ীরা যারা দিনাজপুরে এসে বাগানের ফল আগে-ভাগে গাছেই কিনেছেন, তারা লিচু পরিপক্ব হওয়ার আগেই গাছ থেকে লিচু পেড়ে নিচ্ছেন। কারণ, গাছে লিচু ফেটে ঝরে পড়ছে। যেটুকু গাছে আছে, সেটুকুর দাম যাতে তুলতে পারেন, সেজন্যই তাদের এই প্রচেষ্টা।
দিনাজপুর সদর উপজেলার মহব্বপুর গ্রামের লিচু চাষি মতিউর রহমান জানান, এ বছর মৌসুমের শুরুতেই দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ভোরে কুয়াশাও ছিল। এতে করে মুকুল পুড়ে যায়। তাই লিচুর ফলন কম হয়েছে। এখন আবার শুরু হয়েছে ঝড়-শিলাবৃষ্টি। সব মিলিয়ে লিচুর অবস্থা খারাপ।
মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টি, মাঝে জ্বালানি সংকট এবং সবশেষ কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টির কারণে এবার দিনাজপুরে লিচু উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে জেলার সুমিষ্ট লিচু চাষ ঘিরে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে দুর্যোগের কারণে।
সরেজমিনে শুক্রবার বিকেলে কথা হয় জেলার বিরল উপজেলার লিচু চাষি সুবল রায়ের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদক শাহ আলম শাহীকে বলেন, তার বাগানের অধিকাংশ লিচু পচে ঝরে পড়ছে। কোনোভাবেই গাছে লিচু রাখা যাচ্ছে না। তিনি এবার বড় ধরনের লোকসানে পড়বেন।
বিরল উপজেলার রবিপুর এলাকার লিচু ব্যবসায়ী মোকাররম হোসেন জানান, তার বোম্বাই লিচুর বাগান রয়েছে। শিলাবৃষ্টির কারণে বাগানের লিচু ফেটে ঝরে যাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক স্প্রে করে লিচু রক্ষার চেষ্টা চালিয়েও রক্ষা করা যাচ্ছে না।

একই কথা জানান আজগর আলী, মনসুর ও নজরুল। তারা মৌসুমি লিচু ব্যবসায়ী। তাদের মতো অনেকেই এবার দিনাজপুরে এসে গাছের ফল পেতে আগাম লিচু বাগান কিনে চরম লোকসানে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, নাটোর, বরিশাল ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন তারা। বাগানের ফল আগেই গাছ থেকে ক্রয় করেছেন। কিন্তু তীব্র তাপদাহ, অসময়ের বৃষ্টি, ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বাগানের অধিকাংশ ফল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অনেক চাষি সময়মতো সেচ ও বালাইনাশক স্প্রে করতে না পারায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও এবার লিচুর দাম চাষিরা ভালো পাবেন বলে আশা করছেন কৃষিবিদরা।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দিনাজপুরের বেদানা লিচুর স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়। এবার মৌসুমের শুরুতে প্রচুর মুকুল এলেও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং পরবর্তীতে প্রতিনিয়ত বৃষ্টি, অসময়ে ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে ফুল থেকে ফলে পরিণত হতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফলন উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটেছে। তবে আশা করা হচ্ছে, এবার লিচুর ভালো দাম পাবেন চাষিরা। এবার কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার লিচু বাজারজাত হবে দিনাজপুরে।”
আগামী ২০ মে’র মধ্যে বাজারে লিচু উঠতে শুরু করবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু ঈদুল আজহার কারণে পরিবহন সংকট ও যানজট বিবেচনায় রেখে এবার লিচুর মূল বেচাকেনা হবে ঈদের পর।
লিচুর ফলন বিপর্যয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনাজপুরের রসালো লিচুর দেশজুড়ে সুখ্যাতি রয়েছে। তাই অধিক লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা এবার মৌসুমের শুরুতেই অপরিপক্ব ও স্বাদহীন লিচুতে বাজার সয়লাব করেছেন। বেশি লাভের আশায় বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা গাছ থেকে কাঁচা ও টক লিচু পেড়ে বাজারে বিক্রি করছেন। তবে অপরিপক্ব এসব লিচু খেয়ে শিশুদের বমি, পেটে ব্যথা ও খিঁচুনিসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।
দিনাজপুরের নিউ মার্কেটের লিচুর বাজার এখন অপরিপক্ব লিচুতে সয়লাব। ক্রেতারাও চড়া দামে কিনছেন এসব লিচু। এ লিচু কিনে ক্রেতারা একদিকে লিচুর প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ছেন। আগামী এক সপ্তাহ পর বাজারে পাকা রসালো লিচু উঠবে।

অপরিপক্ব এসব লিচুর বেচাকেনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। খালি পেটে এসব কাঁচা লিচু খেলে শরীরের গ্লুকোজ তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে গুরুতর হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বমি, তীব্র পেটে ব্যথা, খিঁচুনিসহ নানা জটিল সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সেলিম রেজা।
তিনি বলেন, অপরিপক্ব লিচুতে অনেক সময় ক্ষতিকর অর্গানো ফসফরাসযুক্ত কীটনাশক স্প্রে করা হয়, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।








