বর্ষাকালে মৌসুমী নিম্নচাপ বদলে যাচ্ছে অঞ্চলভেদে বৃষ্টির ধরণ। প্রস্তুতি নেই, বাড়ছে ভোগান্তি। বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি, সম্পদহানির পাশাপাশি সহায়-সম্পদের ক্ষতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতি। দীর্ঘমেয়াদে দেশের সড়ক, রাস্তা, ড্রেনেজ, সুইচগেটসহ নানা অবকাঠামোর ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আসুন, বিশ্লেষণে বিষয়টি বিশদভাবে তুলে ধরি।
আজকের বিশ্লেষণে জানব, বিগত কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালে কীভাবে বদলে গেছে বৃষ্টির ধরণ। এর পেছনের কারণ কী? এর প্রভাবে কীভাবে বিগত কয়েক বছর দেশের একেক অঞ্চল ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যা-ভূমিধসের কবলে পড়ছে? ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সহায়-সম্পদ, জমির ফল-ফসল। মৎস্য ও প্রাণীসম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। সর্বোপরি ঘটছে প্রাণহানি। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ‘মনোরম বর্ষাকাল’ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বর্ষাকালের মনোরম বৃষ্টি যেন হঠাৎই ফুলেফেঁপে ভারী বর্ষণে বন্যা-ভূমিধসের আকারে জানমালের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠেছে। আর এমন ভয়ঙ্কর বর্ষাকাল যেন এ দেশে নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে! এর পেছনের কারণ কী?
এখন প্রশ্ন হলো, এ দেশের ‘মনোরম বর্ষাকাল’ কেন হঠাৎই এতটা ভয়াল হয়ে উঠেছে? কোন দিকে যাচ্ছে বর্ষাকালীন পরিস্থিতি? এ দেশের আবহাওয়ার রুদ্র রূপের পেছনের কারণ কি ‘এল নিনো’, নাকি আর কিছু?
আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত এ দেশে বর্ষাকালে মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থেকে প্রচুর বৃষ্টি ঝরায়। তবে গত কয়েক বছরে বর্ষাকালে ‘বৃষ্টির প্যাটার্ন চেঞ্জ’ হচ্ছে। মূলত বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমী নিম্নচাপের কারণেই বৃষ্টির প্যাটার্নের এই পরিবর্তন। ফলে অঞ্চলবিশেষে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আবার এই বৃষ্টিপাতের ধরণ ও স্থান—দুটিই পাল্টেছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে মৌসুমী নিম্নচাপের কারণে দেশের ফেনী অঞ্চলের ওপর একটানা কয়েক দিন রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে অল্প সময়ে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভারী এবং রেকর্ড-পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে।
পরের বছর, ২০২৫ সালে এই মৌসুমী নিম্নচাপের কল্যাণে বর্ষাকালে পরিবর্তিত ‘বৃষ্টির প্যাটার্নে’ ব্যাপক বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে। সেবার ফেনী, নোয়াখালী এবং এর আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হয়েছে।
একইভাবে চলতি বছর ২০২৬-এর জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয় মৌসুমী নিম্নচাপ। পরবর্তীতে স্থল নিম্নচাপটি উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর ও দুর্বল হয়ে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়ে ভারতের মধ্যপ্রদেশে ও তৎসংলগ্ন উত্তর প্রদেশে অবস্থান নেয়। ক্রমান্বয়ে আরও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে স্থল নিম্নচাপটি। তবে এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বৃদ্ধি পায়। এ কারণে মৌসুমি বায়ুর বিশাল অংশ রাজস্থান, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
এর প্রভাবে বাংলাদেশ ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী বায়ু প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকে মৌসুমী নিম্নচাপের কারণে দেশের দক্ষিণের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ শুরু হয়। চট্টগ্রামে ১ জুলাই একদিনেই ২৮৯ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়, যা ১১ বছরের মধ্যে জুলাই মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এর আগে সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই একদিনে ২৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছিল জুলাই মাসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত তিন বছর পরপর এভাবেই মৌসুমী নিম্নচাপের কারণে বর্ষাকালে অঞ্চলবিশেষে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ, বন্যা ও ভূমিধসে সহায়-সম্পদ, মানব ও প্রাণীকূলের প্রাণহানি জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মোহন কুমার দাস বলছেন, মৌসুমী নিম্নচাপের কারণে বর্ষাকালে বৃষ্টির প্যাটার্ন পরিবর্তনের এই ধরনটি আমলে নিতেই হবে। তা না হলে প্রতিবছর এভাবে অঞ্চলবিশেষের ওপর ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি বাড়বেই। বর্ষাকালীন অতি ভারী বর্ষণ থেকে বন্যা ও ভূমিধসের শিকার হবে দেশের সম্পদ, জন ও প্রাণীকূল। বছর বছর এভাবে অধিক বৃষ্টি ও বন্যার কারণে অবকাঠামোতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অতিক্রম করবে বৃষ্টি ও বন্যার সহনীয় মাত্রা।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মোহন কুমার দাস বর্ষাকালীন মৌসুমী নিম্নচাপের কারণে জাতীয় দুর্ভোগ এড়াতে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলছেন, অবশ্যই বর্ষার আগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আগাম পূর্বাভাস দিতে হবে। এর আলোকে স্থানীয় ও অঞ্চলবিশেষের স্থানীয় প্রশাসন, কেন্দ্রীয়ভাবে আন্তঃমন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সংশ্লিষ্টরা প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
এই জলবায়ু ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ বলছেন, বর্ষাকালীন বৃষ্টির প্যাটার্ন চেঞ্জের বিষয়টির জন্য অবশ্যই জরুরি হচ্ছে, ‘জোরদার সিজনাল পূর্বাভাস প্রদান।’ বর্তমানে এই ‘সিজনাল পূর্বাভাস’ না থাকায় স্থানীয় সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে না। তিনি বলছেন, যেহেতু ‘বর্ষাকালীন মৌসুমি নিম্নচাপজনিত ‘বৃষ্টির প্যাটার্নটি’ অনেকটাই নতুন। ফলে বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতাকে আমলে নিয়ে আগাম প্রস্তুতির জোর পরামর্শ এই বিশেষজ্ঞের। তিনি বলছেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দেশে দেশে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। ফলে পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই ‘বর্ষাকালীন মৌসুমী নিম্নচাপজনিত বৃষ্টির প্যাটার্ন’ পরিবর্তিত হয়েছে। এখন নতুন এই প্রবণতা হলো ‘মৌসুমী নিম্নচাপজনিত’ ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ। এই বর্ষণ প্রতিবছর একেক অঞ্চলে এবং সময়ে ঘটছে।
এবারের ‘মৌসুমী নিম্নচাপজনিত বৃষ্টির পরিবর্তিত প্যাটার্নের’ মূল অঞ্চল চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও এর আশপাশের অঞ্চল। ১ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, উখিয়া, সাতকানিয়া, আমিনাবাদসহ প্রায় সারাদেশেই ভারী বর্ষণ চলছে। চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও কক্সবাজারে দীর্ঘস্থায়ী এবং টানা ভারী বর্ষণে ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। বন্যা পরিস্থিতিতে প্রাণহানি বাড়ছে। চলতি বর্ষণে প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এছাড়াও ভোগান্তিতে রয়েছে প্রাণীকূলও।
এই বাস্তবতায় বর্ষার আগেই ‘সিজনাল পূর্বাভাস’ তৈরি এবং এর আলোকে আগাম পরিস্থিতি মোকাবেলার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অঞ্চলবিশেষের জন্য ‘সিজনাল পূর্বাভাসের’ মাধ্যমে প্রাপ্ত আবহাওয়া তথ্য স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়সহ আন্তঃমন্ত্রণালয়ের পূর্ব প্রস্তুতির মাধ্যমেই বর্ষাকালে পরিবর্তিত দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলার আহ্বান তাদের। এর জন্য দুটি বিষয়— ‘সিজনাল পূর্বাভাস’ আমলে নিয়ে উদ্দিষ্ট অঞ্চলবিশেষের ড্রেনেজ সিস্টেম, সুইচ গেট সমূহের সংস্কার ও মেরামত করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং জলাবদ্ধতা নিরসন জরুরি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







