আশি-নব্বই দশকে টেলিভিশন নাটকের জনপ্রিয় মুখ ছিলেন অভিনেত্রী মনিরা দিলশাদ তানি। ছোট পর্দার অজস্র তারকার ভীড়ে তিনিও তখন ছিলেন ভীষণ উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত এবং দীপ্তিময়। অনেক টিভি নাটকে অভিনয় করেন তিনি। ধারাবাহিক নাটকেও ছিলেন। স্নিগ্ধ, পরিপাটি, মিষ্টি-মায়াবী মুখের তানি সে সময়ের টিভি দর্শকদের স্মৃতি থেকে তাই এখনও হারিয়ে যাননি। কিন্তু তিনি হারিয়ে গেছেন টেলিভিশনের পর্দা থেকে। নব্বই দশকের মধ্যভাগে সেই যে নাটক আর অভিনয় ছেড়েছেন এরপর দীর্ঘদিন আর মিডিয়াতে ফিরে আসেননি তানি। চুপচাপ সংসার আর শিক্ষকতা পেশা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। দীর্ঘ জীবনের শিক্ষকতা থেকেও অবসর নিয়েছেন।
সম্প্রতি তিনি আবার মিডিয়াতে ফিরে এসেছেন। তবে নাটক নয়, গানেই তিনি এখন মনোযোগী। টেলিভিশনে অভিনয়ের কালে অবশ্য তিনি গানও গাইতেন। সেই অডিও ক্যাসেটের যুগে একক, মিক্সড অ্যালবাম বেরিয়েছিল তার। তাইতো অভিনয় নয়, তিনি ফিরে এসেছেন গানে।
তথ্য প্রযুক্তির বদৌলতে এখন গণমাধ্যমের ধরণও পাল্টে গেছে। এখন নাটক, গান সবই সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর। আর এখনতো গানের অ্যালবাম বের করার কনসেপ্টই পাল্টে গেছে। সবাই নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল খুলে নিজের গান প্রকাশ করছেন। মনিরা দিলশাদ তানিও নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে নিজের গাওয়া বেশ কয়েকটি গান প্রকাশ করেছেন।
ফেব্রুয়ারিতে এএ প্রোডাকশন নামে ইউটিউব চ্যানেল খুলে শ্রোতা, দর্শকদের মৌলিক গান শোনাবেন বলে তিনি সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখেন। এই ধারাবাহিকতায় আরিয়ান হাশমির কথা ও সুরে ‘এই মন জানে তুমি কে আমার’ নামে একটি মৌলিক গান প্রকাশ করেন। এরপর ফের আরিয়ান হাশমির কথা ও সুরে ‘কত সহজেইতো সব ভুলে যাওয়া যায়’ শিরোনামে আরেকটি মৌলিক গান প্রকাশ করেন। আরও কয়েকটি মৌলিক গান প্রকাশের লক্ষ্যে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন।
মিডিয়াতে তানি এখন এভাবেই এগুবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো তাড়া নেই, আস্তে আস্তে পথ চলার অভিপ্রায় নিয়েছি। এখন গানই করব। আর কিছু নয়।’ টিভি অভিনেত্রী হিসেবে তিনি বেশি পরিচিত হলেও গান তিনি কখনই ছাড়েননি। গান তার চিন্তায়, মননে। একসময় ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তানি। ওখান থেকে নজরুল এবং উচ্চাঙ্গঁ সঙ্গীত শেখেন। এরপর খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন বেশ কিছুদিন।
গানের প্রসঙ্গ ধরেই তিনি জানালেন, তিনি বেতার বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত শিল্পী। আর অডিও ক্যাসেটের যুগে তার মৌলিক গান ছিল অনেকগুলো। ‘চোখের আলো’ নামে একটি অডিও অ্যালবামও করেছিলেন। সুর, সঙ্গীত মনিরা দিলশাদ তানির হ্নদয়ে গাঁথা। সুরের ভুবনেই তাই আনন্দ আর সজীবতা নিয়ে সক্রিয় থাকতে চান। প্রচুর গান শোনেন তানি। পুরনো দিনের সিনেমার গানগুলো তাকে বড় বেশি নিমগ্ন করে। আর তাই ফেসবুকে পছন্দের গানগুলো গেয়ে আপলোড করতে ভুল করেন না।
আবার মন চাইলে লালনগীতি, পল্লীগীতিও গেয়ে ফেলেন। আবার কখনও কখনও কখনও ‘যা-রে যারে উড়ে যারে পাখি’-এরকম কালজয়ী গান ঠোঁটে তুলে স্মৃতির আকাশে চোখ মেলান। গান নিয়ে এরকমই বহুমাত্রিক মগ্নতাতেই তিনি পূর্ণ। কিন্তু নাটকের দিনগুলো কি একেবারে ভুলে গেছেন? আর নাটকে কেন আর নেই? তানির জবাব ‘নাটকে অভিনয় করতে গেলে অনেক সময় দিতে হয়, এনার্জি ও দম লাগে। সে সব এখন আর নেই। আর এখন অভিনয় এনজয় করতে পারি না। এ কারণেই নাটক নিয়ে আর কোনো পরিকল্পনা নেই’।

তবে নাটকের স্মৃতিময় দিনগুলো তাকে বড় বেশি বিষন্ন করে। জানালেন আশির দশকের প্রারম্ভে টেলিভিশন নাটকে তার অভিষেকটাও ছিল সে সময়ের অন্যতম বড় তারকা হুমায়ূন ফরিদীর সাথে। টেলিভিশনে তার জীবনের প্রথম নাটক ছিল ‘মুনমুন’। ‘মুনমুন’ নামের একটি মেয়েকে ঘিরে ছিল গল্পটি। নাটকটির লেখক ছিলেন হাবিবুল হাসান মাখনা ভাই।
নাটকে হমায়ুন ফরিদীর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। প্রখ্যাত টেলিভিশন প্রযোজক প্রয়াত আতিকুল হক চৌধুরীই প্রথম ব্রেকটা দিয়েছিলেন তাকে। টেলিভিশনে অনেক নাটকে অভিনয় সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার তার। বড় বড় অভিনেতা-অভিনেত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে অভিনয়ও করেছেন।
‘ধুপছায়া’, ‘বুমেরাং’, ‘বন্ধু তুমি সায়াহ্নে’, ‘অকুল দরিয়া’,-এররকম ৩০ থেকে ৩৫ এর মতো নাটকে অভিনয় করেন তিনি। বেগম মমতাজ হোসেনের লেখা ধারাবাহিক ‘বড় বাড়ি’তেও তিনি ছিলেন অন্যতম অভিনেত্রী। আরেকটি ধারাবিাহক ‘কন্যা-জায়া- জননী’তেও ছিলেন। কিন্ত নব্বই এর প্রারম্ভে পা ভেঙে গেলে নাটক থেকেও সরে পড়েন।
তানি বলেন, নাটকের সব বড় তারকার সাথে অভিনয় করেছেন তিনি। আছাদুজ্জামান নূও, হুমায়ুন ফরিদী, আফজাল হোসেন, সদরুল পাশার সাথে অভিনয় স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল। আবার আবদুল্লাহ আল মামুনের মতো শক্তিশালী নাট্যকারের লেখা নাটকেও অভিনয় করেছেন।
জীবনের প্রথম টেলিভিশনের নাটক ‘মুনমুন’ এর অভিনয় স্মৃতির পাতায় চোখ রেখে বলেন, ‘হুমায়ুন ফরিদী ভাইকে এখনও মনে পড়ে। প্রথম অভিনীত এই নাটকে উনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেন। শুরুতে আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু ফরিদী ভাই প্রতিটি শটে সাহস যোগাতে থাকেন। অনেক বড় মন আর বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন তিনি।’
টেলিভিশনে অভিনয় করার সময় মিষ্টি মুখের তানি সিনেমাতে অভিনয়ের ডাকও পেয়েছিলেন। ঔপন্যাসিক, নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ এবং পরিচালক শিবলী সাদিক তাকে কাস্ট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শিবলী সাদিকের আহ্বানে সাড়া দেননি। আর হুমায়ূন আহমেদ-এর ডাকে প্রথম সিনেমা ‘শঙ্খনীল কারাগারে’ তাকে অফার করলে সাড়া দেওয়ার পরও অজ্ঞাত কারণে তাকে বাদ দেওয়া হয়।
এতসব স্মৃতি থাকলেও আর অভিনয় নয়, মনিরা দিলশাদ তানি কেবলই গানের মাঝেই থাকতে চান। হোম ইকোনোমিক্স কলেজ থেকে মাস্টার্স করা তানি তিন সন্তানের জননী। দু’সন্তান দেশের বাইরে থাকে। ছোট মেয়ে ঢাকাতেই থাকে। সংসার জীবনের অবসরে ঘুরতে পছন্দ করেন। আর ঘুরতে গেলেও গান ছাড়তে পারেন না। গান গেয়ে চলেন অবিরাম।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








