৮ বছর বয়সী সামা তুবার আয়নার দিকে তাকিয়ে চুল আঁচড়ানোর ভান করে, তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। ‘আমার কষ্ট, আমার আঁচড়ানোর মতো একটি চুলও নেই।’ সামার জন্য এটি শুধুই স্মৃতির অংশ। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর আগে, যখন তার লম্বা চুল ছিল, তখন সে গাজার জাবালিয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলত। কিন্তু সেই জীবন এখন শুধু স্মৃতি। এরপর থেকে তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। সামার মতো মানসিক আঘাতে জর্জরিত গাজার হাজার হাজার শিশু।
আজ (১৯ মার্চ) বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিএনএন জানিয়েছে, গাজার ১২ লাখ শিশুর প্রায় সবাই মানসিক সহায়তা চায়, বিশেষ করে যারা বারবার আঘাতজনিত ঘটনার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। ইসরায়েলের হামলায় গাজায় ৪৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৯৬ শতাংশ শিশু মনে করে তাদের মৃত্যু আসন্ন, এবং ৪৯ শতাংশ শিশু ইসরায়েলের হামলার কারণে ‘মরতে চায়’ বলে জানিয়েছে।
চুল পড়ে যাচ্ছে শিশুদের
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে সামা এবং তার পরিবার গাজা উত্তরের জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ইসরায়েলের হামলায় তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, এবং সামা এখন খান ইউনিসের একটি শিবিরে বসবাস করছে। সামার চুল পড়ে যাওয়া শুরু হয়েছে ‘নার্ভাস শক’ এর কারণে, যা তার প্রতিবেশীর বাড়িতে ইসরায়েলি হামলার পর দেখা দেয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সামা তার মা ওম-মোহাম্মদকে প্রশ্ন করে, ‘মা, আমি ক্লান্ত, আমি মরে যেতে চাই। আমার চুল কেন গজাচ্ছে না?’ এরপর জানতে চায়, সে কি চিরকাল এমন টাক থাকবে? ‘আমি মরে যেতে চাই এবং জান্নাতে গিয়ে চুল ফিরে পেতে চাই, ইনশাআল্লাহ’।
সামার জন্য মানসিক যন্ত্রণা আরও গভীর হয় যখন চুল হারানোর কারণে অন্য শিশুরা তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করতে শুরু করে। লজ্জায় সে ঘরবন্দী হয়ে পড়ে। বাইরে গেলে সবসময় একটি গোলাপি কাপড় পেঁচিয়ে মাথা ঢেকে রাখতে হয় তাকে। সামা এখন বাঁচতে ভয় পায়। সামার মতো অনেক শিশুই মৃত্যুর কথা ভাবছে।
‘একটি ড্রোন এল, তাদের হত্যা করল’
সাত বছর বয়সী আনাস আবু আইশ এবং তার আট বছর বয়সী বোন দোয়া দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকার একটি শরণার্থী শিবিরে তাদের দাদী ওম-আলাবেদের সঙ্গে বসবাস করছে। ইসরায়েলি হামলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে এই দুই শিশু। ‘আমি তখন আমার বল নিয়ে খেলছিলাম। নিচে নেমে দেখি বাবা-মা রাস্তায় পড়ে আছে, একটি ড্রোন এলো এবং তাদের ওপর বিস্ফোরণ ঘটালো,’ ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে সিএনএনকে বলে আনাস।
ওম-আলাবেদ জানান, বাবা-মাকে হারানোর পর থেকে শিশু দুটি গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে আছে। আনাস প্রায়ই আক্রমণাত্মক আচরণ করে, বিশেষ করে যখন সে দেখে অন্য শিশুদের তাদের মায়েরা জড়িয়ে ধরছে। ‘আমি সবাইকে বারবার অনুরোধ করি, যেন তারা বুঝতে চেষ্টা করে। সে শুধু তার বাবা-মাকেই হারায়নি, বরং নিরাপত্তা, স্নেহ, ভালোবাসা—সবকিছুই হারিয়েছে,’ বলেন ওম-আলাবেদ। সিএনএন যখন দোয়ার সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন সে নিজের নখ চেপে ধরে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছিল। কয়েক সেকেন্ড পর সে কেঁদে উঠে।
শিশুদের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য, দাদীর সম্মতিতে, ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানী এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক এডনা ফোয়া ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করেন। তিনি জানান, আনাস ও দোয়া এখনও অনুভূতি প্রকাশ করছে, যা তাদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।
‘আমার মুখে বালু ছিল, চিৎকার করছিলাম’
একই শরণার্থী শিবিরে ছয় বছর বয়সী মানাল জৌদা নিভৃত স্বরে বর্ণনা করে সেই রাতের কথা, যেদিন তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে বাবা-মা নিহত হয়। সে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিল। বেঁচে থাকার জন্য নিরুপায় অপেক্ষার মুহূর্তগুলো এখনও স্পষ্ট মনে আছে তার। ‘আমার মুখে বালু ছিল, আমি চিৎকার করছিলাম। তারা কোদাল দিয়ে খুঁড়ছিল। আমি জেগে ছিলাম, ধ্বংসস্তূপের নিচেও আমার চোখ খোলা ছিল, মুখ খোলা ছিল, আর তাতে বালু ঢুকছিল’।
ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানী এডনা ফোয়া বলেন, মানালের মতো শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাদের মস্তিষ্ক ভবিষ্যতে এই যন্ত্রণা বহন করতে না হয়। এ ধরনের শিশুকে আমি পর্যবেক্ষণে রাখবো, যদি এমন কোনো উপায় থাকে যার মাধ্যমে তার মস্তিষ্কে জমা হওয়া ব্যথা কমানো যায়।’
যুদ্ধবিরতি হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন, বলেন এডনা ফোয়া। তবে সঠিক চিকিৎসা পেলে ফিলিস্তিনি শিশুরা অন্তত আংশিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে বলে মনে করেন তিনি। ‘তবে তারা আর কখনোই যুদ্ধের আগের মতো হতে পারবে না, কিন্তু তারা এমনভাবে পুনরুদ্ধার করতে পারবে, যাতে অন্তত স্বাভাবিকভাবে জীবন চালিয়ে যেতে পারে,’ বলেন ফোয়া।
চ্যালেঞ্জের মুখে গাজার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
গাজায় মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান দিন দিন চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। গাজা কমিউনিটি মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম জিসিএমএইচপি এর পরিচালক ড. ইয়াসের আবু জামেই বলেন, আমার কর্মীরা নিজেরাও আঘাতপ্রাপ্ত, যা অন্যদের চিকিৎসা করা কঠিন করে তুলেছে।
আবু জামাই এক শিশুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বন্ধু স্বর্গে চলে গেছে, তবে একজনের মাথা পাওয়া যায়নি,’ শিশুটি এ কথা বলার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে। ‘তার মাথা ছাড়া সে কীভাবে স্বর্গে গেল?’

জিসিএমএইচপি শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে ‘ড্রয়িং থেরাপি’ বা আঁকিবুকির মাধ্যমে অভিব্যক্তি প্রকাশের সুযোগ দেয়, যা তাদের অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশে সহায়তা করে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার সময় জিসিএমএইচপি ছয় মাসব্যাপী একটি মানসিক স্বাস্থ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছিল, যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। তবে আবু জামাই জানান, কর্মীরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও সামনে যে কঠিন পথ অপেক্ষা করছে, তার ভার তারা অনুভব করছেন।








