ছিনতাইয়ের আখড়ায় পরিণত হয়েছে মোহাম্মদপুরের বেশ কয়েকটি এলাকা। কিশোর গ্যাংয়ের পাঁচটি গ্রুপ এসব ছিনতাই কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে এসব ছিনতাই করছে একদল ১৭-২৩ বয়সী ছিনতাইকারী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, চিহ্নিত এলাকাগুলোয় টহল বাড়ানো হয়েছে। লাগাতার অভিযানে ছিনতাইকারীদের আটক করা হচ্ছে।
টার্গেট যখন শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল, মোবাইল ও নগদ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। মোহাম্মদপুরের একটি নাম করা স্কুলের শিক্ষার্থী শোয়েব (ছদ্মনাম)। স্কুলের পশ্চিম পাশের গেট বের হয়ে কিছুদূর আসার পরই পাঁচ থেকে ছয় জনের একটা গ্রুপ তার গতিরোধ করে। পরে দেশীয় চাকু ও খুরের ভয় দেখিয়ে স্মার্ট ফোন ও ওয়ালেট নিয়ে যায়।
শোয়েব জানালেন, নিজের এলাকায় এমনটা হবে ভাবতেও পারেননি। খানিকটা এগুলোই তাদের বাসা। ওরা এমনভাবে আমাকে ঘিরে কথা বলা ও মোবাইলে গান বাজাচ্ছিল কেউ বুঝতেই পারবে না ছিনতাই করা হচ্ছে। মনে হবে বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে।
মারুফ (ছদ্মনাম) সন্ধ্যার পর প্রাইভেট শেষ করে তাজমহল রোডের কিশলয় স্কুলের সামনের থেকে যাচ্ছিলেন শেখেরটেক বাসার দিকে। সেখানেই দলবদ্ধ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যের খপ্পড়ে পড়েন তিনি। যদিও তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
মারুফ জানালেন, তিনি বুঝতে পেরে তাদের সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে একটু ছুটে সামনের ভিড় রাস্তায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছিনতাইকারীদের গ্রুপের দুই সদস্য রাস্তার সামনের গলিতে তাকে ধরে ফেলে এবং চড় থাপ্পড় মারা শুরু করে। এসময় কয়েকজন লোকজন সামনে এগিয়ে আসতে থাকলে ওই ছিনতাইকারীরা বলতে থাকে, ‘আর কখনো আমার বোনকে বিরক্ত করবি না’। পরে মোবাইল নিতে না পারলেও ছিনতাইকারীরা পেছনের পকেট থেকে ওয়ালেট নিয়ে যায়।
বাদ যাচ্ছে না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রাইডাররা
সম্প্রতি ছিনতাইকারীদের খপ্পড়ে পড়েছেন বাঁশবাড়ির ফেক্সিলোড ব্যবসায়ী মালেক মোল্লা (ছদ্মনাম)। রাতের ঢাকা উদ্যানে বাড়ি ফেরার সময় তিনি কয়েকজন ছিনতাইকারীর খপ্পড়ে পড়েন।
তিনি জানান, রাত প্রায় একটার কাছাকাছি। সিগারেটের আগুন ধরাতে এক ব্যক্তি লাইটার চায়। সিগারেটের আগুন থেকে সিগারেট ধরানোর সময় চোখে ছাই যাওয়ার ভান করে। পরে পেছন থেকে অন্য দু’জন পিঠে দেশীয় অস্ত্র ঠেকিয়ে নগদ টাকা ও ফেক্সিলোডের দুটি মোবাইল নিয়ে যায়।
মোটরবাইকে রাইড শেয়ার করেন মাসুদ হোসেন, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে রোইড শেষ করে ফেরার পথে আক্রমণের শিকার হন সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের। তাদের অস্ত্রের আঘাতে আহত হন তিনি।
নিরিবিলি রাস্তায় ওৎ পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা
রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের পশ্চিম পাশের এলাকা, ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন এলাকা, সরকারি আইডিয়াল প্রাইমারি স্কুল, মোহাম্মদপুর সরকারি স্কুলের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের এলাকা, কিশলয় স্কুলের সামনের এলাকা, আদাবর, শ্যামলী থেকে রিং রোডের বিভিন্ন অলিগিলি, জাকির হোসেন রোড সংলগ্ন এলাকায় ছিনতাই বেশি হয় বলে জানা গেছে। মুলত: আসাদ গেট-মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সড়কের উত্তর পাশের পুরো আবাসিক এলাকায় নিরিবিলি রাস্তায় এই ছিনতাই হয়ে থাকে।
এছাড়াও মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান লাউতলা, শাহজালাল হাউজিং, স্বপ্নধারা হাউজিং, রায়েরবাজার বোর্ডঘাট এলাকায় পাঁচটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সক্রিয়। সবচেয়ে সক্রিয় পাটালি গ্রুপ। মাগুর হাসান ওরফে মাগুরের নেতৃত্বে এ গ্রুপের ৫০-৬০ জন মাদক বিক্রি ও ছিনতাইয়ে জড়িত।
যা বলছেন স্থানীয়রা
মাঝে মাঝেই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। অস্ত্রের মুখে সব কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।
মোহাম্মদপুরে বসবাসকারী আবদুল্লাহ হিল কাইয়ূম বলেন, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা এলাকায় কিশোর অপরাধী, ছিনতাইকারী, ইভটিজার এবং বেপরোয়া মটর সাইকেল চালানো মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছে। আমি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আপনারাও ই-মেইল করেন, টেক্সট পাঠান।
তাপস আহমেদ নামে আরেক বাসিন্দা বললেন, ঈদগাহ ময়দানের পূর্ব পার্শ্বে গলি থেকে বেরিয়ে কোচিং ফেরত, স্কুল -কলেজ ফেরত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দিনের বেলায় মোবাইল নিয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন, বাইসাইকেল, হাতঘড়ি এমনকি নগদ ১০/২০ টাকা পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা পুলিশের কাছে অভিযোগ কম করেন। ছিনতাইকারীরা পরে যদি রাস্তায় সন্তানের কোন ক্ষতি করে- এই আশঙ্কায়।
টহল বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. গোলাম সবুর বলেন, চিহ্নিত এলাকাগুলোয় টহল বাড়ানোর পাশাপাশি ছিনতাইকারীদের আটক করা হচ্ছে। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিবি নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
র্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন খান বলেন: ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং নিয়ে সব ইউনিট কাজ করছে। আশা করছি-খুব শিগগিরই অপরাধীরা ধরা পড়বে। আমরা গত ২৮ জানুয়ারি রাতে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, সদরঘাট ও ফরিদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং বিডিএসকে (ব্রেড ডেঞ্জার স্ট্রং কিং) গ্রুপের লিডার হৃদয়সহ তার আট সহযোগীকে দেশি-বিদেশি অস্ত্রসহ আটক করি।







