যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম উঠে আসা নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় সরকার একে ‘ভিত্তিহীন ও নিন্দনীয়’ বলে উড়িয়ে দিলেও, বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে সামনে রেখে আক্রমণ আরও ধারালো করছে। এই আবহে প্রশ্ন উঠছে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে এই বিতর্কের কোনো বাস্তব প্রভাব পড়তে পারে?
মোদির দল বিজেপির বিরোধী তৃণমূল পার্টি ইতিমধ্যেই তাদের এক্স পোস্টে বিষয়টি তুলে ধরে একে দেশের অপমান বলে দাবি করেছে। কংগ্রেসও একই সুরে ‘জাতীয় লজ্জা’র কথা বলছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান রাজনৈতিক লড়াই দীর্ঘদিন ধরেই ‘নৈতিকতা বনাম ক্ষমতার অপব্যবহার’ এই বয়ানে আবর্তিত। এপস্টেইন নথি নিয়ে তৈরি বিতর্ক সেই বয়ানকে নতুন করে জোরালো করার সুযোগ দিচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগ
মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত যে নথিগুলি প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে ২০১৭ সালের একটি কথিত ইমেইলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম উল্লেখ থাকার দাবি সামনে এসেছে। ওই মেইলটি নাকি লিখেছিলেন কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন নিজে। এই মেইলই পুরো বিতর্কের মূল সূত্র। ওই কথিত মেইলে এপস্টেইন দাবি করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার পরামর্শ অনুসরণ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থে মোদি ইসরায়েল সফরের সময় নাচ-গানসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং এপস্টেইনের ভাষায়, পরিকল্পনাটি সফল হয়েছিল।
বিরোধীদের কটাক্ষ
কংগ্রেসের নেতা জয়রাম রমেশ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “মার্কিন সরকারের অবমুক্ত করা নথিতে মোদির নাম একাধিকবার এসেছে। এতে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।” কংগ্রেসের আরেক নেতা পবন খেরা লিখেছেন, “এই বিষয়টি আমাদের জন্য জাতীয় লজ্জা।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের এক্স পোস্টে বলা হয়, পোস্টে বলা হয়েছে, “এপস্টেইন ফাইলসে দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়ানো বিশ্বের দরবারে দেশের অপমান। যদি এই অভিযোগের সামান্যতম সত্যতা থাকে, প্রধানমন্ত্রীকে স্বচ্ছভাবে জবাব দিতে হবে।”
বিজেপি ও ভারত সরকারের বক্তব্য
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি একজন দণ্ডিত অপরাধীর ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত দাবি ছাড়া কিছু নয়। ভারত সরকার জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ২০১৭ সালের ইসরায়েল সফর ছিল সম্পূর্ণ সরকারি ও স্বচ্ছ, এবং ইমেইলে উল্লিখিত অন্য সব দাবিও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
বিজেপি নেতা সম্বিত পাত্র বলেছেন, এই ইস্যুতে শূন্য প্রমাণ আছে মোদি ও এপস্টেইনের মধ্যে কোনো সরাসরি বা পরোক্ষ যোগাযোগের। কংগ্রেস বিভ্রান্তির গল্প ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা এপস্টেইনের ইমেইল থেকে ‘মোদি টুক এডভাইস’ বা এই ধরনের শব্দ যোগ করে রাজনৈতিক আক্রমণ বানিয়েছে। মূল নথিতে সেগুলো নেই। এই দাবিগুলো মিথ্যা বা ভুল ব্যাখ্যা এবং এর মাধ্যমে মোদির ভাবমূর্তি ও ভারতের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আরেক নেতা ভূপেন্দ্র যাদব মালব্য বলেছেন, বিরোধীরা এমন অর্ধসত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে রাজনৈতিক লাভের জন্য বড় করে তুলছে। যদি জাতীয় লজ্জা কিছু থাকে, সেটি হলো অর্ধসত্য ছড়িয়ে দেশের নেতৃত্বকে ভণ্ডুল করা। যে নথিগুলো কোন বিশ্বাসযোগ্য মূল ভিত্তি ছাড়াই রাজনৈতিক ইস্যু তৈরির চেষ্টা করছে বিরোধীরা।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে (২৬ বা ২৭ ফেব্রুয়ারি) শুরু হতে পারে । ভোটগ্রহণ ৩ থেকে ৪ দফায় হতে পারে, কারণ ১৫ এপ্রিলের মধ্যে নতুন সরকার গঠন করতে হবে। ভোটের প্রচার মার্চ মাসে চলতে পারে এবং ফলাফল ঘোষণা ও সরকার গঠন হবে এপ্রিলের মাঝামাঝি।
এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস মোদির নাম এপস্টেইনের নথিতে উল্লেখ থাকাকে জাতীয় লজ্জা ও দেশের মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে। তারা এই ইস্যুকে ভোটারদের নৈতিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। এতে শহুরে ও সোশ্যাল মিডিয়া সচেতন ভোটারদের মনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এমন ইমেলে জড়াতে পারে।
রাজনৈতিক চাপ
সব দিক বিচার করলে বলা যায়, এপস্টেইনের নথিতে মোদির নাম উঠে আসা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মূল নির্ধারক ইস্যু হয়ে উঠবে এমন সম্ভাবনা কম। তবে এটি বিরোধীদের হাতে একটি অতিরিক্ত রাজনৈতিক অস্ত্র, যা নির্বাচনী প্রচারের উত্তাপ বাড়াবে এবং বিজেপিকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রাখার চেষ্টা করবে। ভোটের ফল শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে রাজ্যের মাটিতে থাকা বাস্তব সমস্যা ও রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তির ওপর। কিন্তু এই বিতর্ক যে নির্বাচনের আবহে শব্দ, তর্ক এবং রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে তা প্রায় নিশ্চিত।
এখানে স্পষ্ট করে বলা জরুরি, মোদির বিরুদ্ধে কোনো যৌন নিপীড়ন, মানবপাচার বা এপস্টেইনের অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ তোলা হয়নি। তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই এবং কোনো আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা তাকে অভিযুক্ত করেনি। পুরো বিতর্কটি একটি ব্যক্তিগত ইমেইলের দাবিকে ঘিরে।








