অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ফুটবলের মহাতারকা মেসির জন্য এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলই হবে শেষ বিশ্বকাপ। বয়স এবং অন্যান্য সব বিবেচনায় সামনে তিনি আর কোন বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন না বলেই অনুমিত। ষষ্ঠবারের মতো এবারের বিশ্বকাপ খেলবেন তিনি। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে অনেকগুলো রেকর্ড গড়া এবং আরও উচ্চতায় ওঠার হাতছানি রয়েছে তার সামনে। বিশেষ করে বিশ্বকাপে সেরা গোলদাতার আসনটি দখলের ক্ষেত্রে তার জন্য যে অপার সুযোগ রয়েছে তা অন্য যেকোনো খেলোড়ারের থেকে বেশি। মেসির পেছনেই অবশ্য রয়েছেন শুধুমাত্র ফ্রান্সের কাইলিয়ান এমবাপে। ফুটবলে যিনি মহা এক ঘাতক হিসেবেই খ্যাত।
বিশ্বকাপ ফুটবলে মেসির মোট গোল এখন ১৩টি। আর্জেন্টিনার পক্ষে মেসিই এখন সর্বোচ্চ গোলদাতা। মেসির ওপরে রয়েছেন মাত্র তিনজন স্ট্রাইকার। এই তিনজন হলেন পশ্চিম জার্মানির জার্ড মুলার, ব্রাজিলের রোনাল্ডো এবং জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। এই তিনজনই ফুটবল থেকে বিদায় নিয়েছেন অনেক আগেই। সবার শীর্ষে থাকা জার্মনির মিরোস্লাভ ক্লোসার গোল সংখ্যা ১৬টি। এরপর ব্রাজিলের রোনালদোর রয়েছে ১৫টি। তৃতীয় স্থানে থাকা জার্ড মুলারের গোলের সংখ্যা ১৪টি। আর ১২টি গোল করে মেসির পেছনে রয়েছেন ফ্রান্সের কাইলিয়ান এমবাপে। মূলত এই দুজনই এখন খেলার মাঠে সজীব ও সচল রয়েছেন।
এপর্যন্ত মেসি মোট ৫টি বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার গৌরব অর্জন করেছেন। ২০০৬ থেকে টানা ২০২২ পর্যন্ত খেলেছেন। বিগত পাঁচবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে মেসির পা থেকে এসেছে মোট ১৩টি গোল। আর এই গোল এসেছে মোট ২৬টি ম্যাচ থেকে। বিশ্বকাপ ফুটবলে মেসির প্রথম গোলটি আসে ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে। এই বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘সি’তে ছিল আর্জেন্টিনা। গ্রুপে অন্য প্রতিপক্ষ ছিল নেদারল্যান্ডস, আইভরি কোস্ট এবং সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো। ২০০৬ সালের ১৬ জুন গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে আর্জেন্টিনা সার্বিয়ার বিপক্ষে ৬-০ গোলে জয়লাভ করে। আর্জেন্টিনার রদ্রিগেজ, ক্যামবিয়াসো, ক্রেসপো, তেভেজের সাথে তরুণ মেসিও গোল করেন। ৮৮তম মিনিটে বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ গোলটি করেন তিনি। এই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে পরাজিত হয় আর্জেন্টিনা। পরের বিশ্বকাপ ২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকাতে অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘বি’তে ছিল আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল সাউথ কোরিয়া, গ্রীস এবং নাইজেরিয়া। আর্জেন্টিনা গ্রুপ চ্যাস্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। দ্বিতীয় রাউন্ডে মেক্সিকোকে ৩-১ গোলে হারাতে পারলেও কোয়ার্টার ফাইনালে জামানির কাছে ৪-০ গোলে পরাজিত হতে হয়। এই বিশ্বকাপে মেসি গোল করতে ব্যর্থ হন।
২০১৪ সালে ব্রাজিলে বিশতম বিশ্বকাপের আসর বসে। এই বিশ্বকাপে ফাইনালে জার্মানের কাছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১-০ গোলে হেরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া থেকে বঞ্চিত হয় আর্জেন্টিনা। গ্রুপ ‘এফ’তে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ছিল নাইজেরিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং ইরান। আজেন্টিনা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠে। ১৫ জুন গ্রুপের প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনা বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়লাভ করে। খেলার ৬৫তম মিনিটে দীর্ঘ গোলখরা ভেঙে আর্জেন্টিনার পক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেন মেসি। ২১ জুন আবার গোলের দেখা পান তিনি। ইরানের সাথে গ্রুপ ম্যাচে ৯১তম মিনিট জয়সূচক গোলটি করেনি মেসি। এরপর ২৫ জুন আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়া মধ্যে এক দুর্দান্ত ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। দম আটকে যাওয়া সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে জয়লাভ করে। ম্যাচের প্রথম গালটি করেন মেসি। ৪৫ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটিও করেন। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠলেও মেসি আর কোন গোল পাননি। এই বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল ছিল ৪টি।
২০১৮ সালের রাশিয়াতে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা গ্রুপে প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় আইসল্যান্ড, নাইজেরিয়া এবং ক্রোয়েশিয়াকে। ১৬ জুন অনুষ্ঠিত গ্রুপের প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেন মেসি। এই ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র হয়। তবে ২৬ জুন দ্বিতীয় ম্যাচে মেসি গোল করেন শক্তিশালী নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। ৪৫ মিনিটের সময় দুর্দান্ত এক গোল উপহার দেন তিনি। এ ম্যাচে ২-১ গোলে জয়ী হয় আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা থেকেই আর্জেন্টিনা বাদ পড়ার কারণে মেসিকে এক বুক দুঃখ নিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলকে বিদায় জানাতে হয়।
তবে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন সবচেয়ে সফল এবং উজ্জ্বল। গৌরবের মুকুট পরেন এই বিশ্বকাপেই। সে সময় ৩৫ বছর বয়সী মেসি বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে কাতারে অনুষ্ঠিত ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেন এবং দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সব প্রত্যাশার প্রতিদান দেন। মেসি সাত ম্যাচে সাতটি গোল করেন। যদিও ফ্রান্সের এমবাপের গোলসংখ্যার চেয়ে একটি গোল কম করায় গোল্ডেন বুট জিততে পারেননি, তবুও তার অসাধারণ পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর পর ঐতিহাসিক তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মেসি দুটি গোল করেন। এছাড়া এই টুর্নামেন্টে তিনি নকআউট পর্বের চারটি ধাপেই (শেষ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল) গোল করার বিরল কীর্তি গড়েন, যা এর আগে বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোন খেলোয়াড় করতে পারেননি। প্রতিটি ম্যাচেই তার গোল করার অদম্য ক্ষমতা বিশ্বকাপ মঞ্চকে বড় বেশি মহিমান্বিত করেছিল।
২০২২ সালের সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসি চাইলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ে বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি আরও একবার বিশ্বমঞ্চে নিজের জাদু দেখাতে উদগ্রীব। ৩৮ বছর বয়সী এই তারকা এবারও আর্জেন্টিনা দলকে নেতৃত্ব দেবেন। লক্ষ্য, ছয় দশকেরও বেশি সময় পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়া। আর ঠিকটাক মতো খেলতে পারলে বিশ্বকাপে গোল করার সর্বোচ্চ আসনটিও তার দখলে চলে যেতে পারে।







