বিশ্বকাপ ফুটবলে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কাতারে শিরোপা উঁচিয়ে ধরা দলটির গত চার বছরের রেকর্ডও বেশ সমৃদ্ধ। মাঝে একটি কোপা আমেরিকাও জিতেছে। বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারের বাছাইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে হারের আগে টানা ১৪ ম্যাচ জিতেছে। সবশেষ টানা দ্বিতীয় আসরে সেমিফাইনালে উঠেছে। শেষ চারে যাদের হারের রেকর্ড নেই।
এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৬ বার সেমিফাইনাল খেলেছে। একবারও হারেনি। এই ছয় জয়ে ফাইনালে পৌঁছে তিনবার শিরোপা জিতেছে, তিনবার হয়েছে রানার্সআপ। আর্জেন্টিনার ছয় সেমি ও ফাইনালগুলো ছিল- ১৯৩০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯০, ২০১৪ এবং ২০২২ আসরে। এবার সপ্তমবারের মতো সেমিফাইনালে খেলবে আলবিসেলেস্তেরা।
২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপের আগে পৌঁছা ৬টি সেমিফাইনালে অপরাজিত আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নামার আগে এই পরিসংখ্যান স্বস্তির বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের জন্য। ১৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের আটালান্টার বিখ্যাত মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে নামবে দুদল। খেলা বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথমবার সেমি খেলে ফিফা আয়োজনের প্রথম আসরেই, ১৯৩০ সালে। সেবার যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন মেসি-ম্যারাডোনার পূর্বসুরিরা। ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হেরে রানার্সআপে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের প্রথম আসরই বসেছিল উরুগুয়েতে।
আর্জেন্টিনা দ্বিতীয়বার সেমির পথ পেরোয় ১৯৭৮ সালে। আসরে প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছিল তারা। আসরে সেমিতে খেলার সুযোগ ছিল না। প্রথম রাউন্ড পার করা ৮টি দল নিয়ে দুটি গ্রুপ হয়েছিল, আর্জেন্টিনা গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় সরাসরি ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সে ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় লাতিন দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছিল তারা।

আর্জেন্টিনা তৃতীয়বার সেমির খোঁজ পায় মেক্সিকো বিশ্বকাপে। ১৯৮৬ সালের আসরে সেমিতে তারা জিতেছিল ২-০ গোলে, ইউরোপীয় বেলজিয়ামের বিপক্ষে। আলবিসেলেস্তেদের অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা দুটি গোল করেছিলেন, যার একটি ছিল চিরস্মরণীয় নজরকাড়া। সেমিতে জয়ের পর ম্যারাডোনার জাদুকরী পারফরম্যান্সে মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয় শিরোপা জিতেছিল দেশটি।
১৯৮৬ সালে জেতা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের রেশ ধরে ১৯৯০ আসরে টানা দ্বিতীয় ফাইনাল খেলেছিল ম্যারাডোনার দল। এবার আর শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জেতা আর্জেন্টাইনরা সেবার শিরোপা হারায় ওই পশ্চিম জার্মানির কাছেই। ইতালির রোমে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানি ১-০ গোলে শিরোপা জিতেছিল। তার আগে আর্জেন্টিনা স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে সেমিতে খেলেছিল। ম্যাচ ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে উঠেছিল ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।
১৯৯০ আসরের ফাইনালের পর ২৪ বছর পেরিয়ে সেমির খোঁজ পায় আর্জেন্টিনা। দুইযুগ পর আবারও সেমিতে নেমে জয়ের ধারা অক্ষত রাখে। সেবার দাপটে ফাইনালে উঠেছিল লিওনেল মেসির দল। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিতে খেলেছিলেন মেসিরা। সাও পাওলোর করিস্থিয়ান্স স্টেডিয়ামে সেমিতে নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য ড্র ছিল, অতিরিক্ত সময়েও সমাধান হয়নি। টাইব্রেকারে ডাচদের ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে উঠে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল মেসিদের।

বিশ্বআসরে মেসিরা ষষ্ঠ তথা সবশেষ সেমি খেলে গত কাতার বিশ্বকাপে। এবং যথারীতি সেমিতে জয়ের রেকর্ড অক্ষত রাখে আকাশি-নীলরা। আর ফাইনালে হতাশ হতে হয়নি মেসিদের। ফাইনালে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আবারও শিরোপা ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ্য হয় আর্জেন্টাইনদের। তার আগে দলটি সেমিতে লড়েছিল ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষ ও আগের বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। সেমিতে ৩-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে উঠেছিল লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
এবারের বিশ্বকাপে এখনও অপ্রতিরোধ্য বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গ্রুপ ‘জে’তে সব ম্যাচ জিতে গ্রুপসেরা হয়েছিল। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০, পরে অস্ট্রিয়াকে ২-০ এবং জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে প্রথম নকআউট রাউন্ড অব ৩২-এ নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের ঝড়ে ৩-২ গোলে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছিল। ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে ২ গোলে পিছিয়ে পড়ে অবিশ্বাস্য রূপকথার গল্প লিখে ৩-২এ জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টারে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে সেমিতে উঠে গেছে।
দেখার পালা বিশ্বআসরে সেমিতে কোন ম্যাচ না হারার রেকর্ড আর্জেন্টিনা অক্ষত রাখতে পারে কিনা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ১৬ জুলাই জানা যাবে ইতিহাস মেসিদের পক্ষেই থাকে নাকি বিপক্ষে যায়। জিততে পারলে তো টানা দ্বিতীয় আসরে ফাইনালের মঞ্চ খুঁজে পাবে।







