বিনোদন

‘মিট দ্য প্রেস’: ৭৯ বছর ধরে ক্ষমতার মুখোমুখি সাংবাদিকতা

‘মিট দ্য প্রেস’: ৭৯ বছর ধরে ক্ষমতার মুখোমুখি সাংবাদিকতা

১৯৪৭ সালের ৬ নভেম্বর। টেলিভিশন তখনও মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল একটি ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান। রাজনীতিক ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সাংবাদিকদের সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি করার সেই উদ্যোগই একদিন হয়ে ওঠে বিশ্ব টেলিভিশন সাংবাদিকতার ইতিহাসে অনন্য প্রতিষ্ঠান: ‘মিট দ্য প্রেস’।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র দুই বছর আগে। পৃথিবীজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বাড়ছে উত্তেজনা। অন্যদিকে, গণযোগাযোগের নতুন মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে মানুষের জীবনে।

ঠিক এমন সময়ে, ১৯৪৭ সালের ৬ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি টেলিভিশনে যাত্রা শুরু করে ‘মিট দ্য প্রেস’। অনুষ্ঠানটির মূল ধারণা ছিল সহজ, কিন্তু সেই সময়ের জন্য সাহসী; ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন, আর দর্শক দেখবেন তাদের জবাব।

কে জানত, সেই ছোট্ট উদ্যোগই একদিন বিশ্ব টেলিভিশনের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে!

২০২৬ সালের ৬ নভেম্বর ‘মিট দ্য প্রেস’-এর টেলিভিশন যাত্রার ৭৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে। প্রায় আট দশক পরও অনুষ্ঠানটি মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কখনো কখনো একটি যথার্থ প্রশ্ন।

রেডিও থেকে টেলিভিশন: এক নতুন যুগের শুরু

‘মিট দ্য প্রেস’-এর জন্ম অবশ্য টেলিভিশনের পর্দায় নয়। এর সূচনা হয়েছিল রেডিওতে, ১৯৪৫ সালের ৫ অক্টোবর। সাংবাদিক মার্থা রাউন্ট্রি এবং প্রকাশক লরেন্স ই. স্পিভাক যৌথভাবে অনুষ্ঠানটি তৈরি করেন। শুরুতে এটি ছিল দ্য আমেরিকান মার্কারি সাময়িকীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি রেডিও আয়োজন।

অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হতো মিউচুয়াল ব্রডকাস্টিং সিস্টেমে। তখনকার প্রচলিত সাক্ষাৎকারের ধরন থেকে এটি ছিল আলাদা। এখানে একজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে ঘিরে বসতেন একাধিক সাংবাদিক। তারা প্রশ্ন করতেন রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয়ে।

সেই রেডিও অনুষ্ঠানই দুই বছর পর টেলিভিশনে আসে।

১৯৪৭ সালের ৬ নভেম্বর প্রথম টেলিভিশন পর্বের অতিথি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পোস্টমাস্টার জেনারেল এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক জাতীয় চেয়ারম্যান জেমস এ. ফারলি।

টেলিভিশনের পর্দায় নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হলো। এতদিন মানুষ রাজনীতিকদের বক্তব্য শুনত রেডিওতে কিংবা পড়ত সংবাদপত্রে। এবার সরাসরি দেখতে পেল তাঁদের মুখভঙ্গি, প্রতিক্রিয়া, প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ধরন। সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

এক নারীর হাত ধরে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় নতুন অধ্যায়

‘মিট দ্য প্রেস’-এর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নামগুলোর একটি মার্থা রাউন্ট্রি। তিনি শুধু অনুষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, ছিলেন প্রথম সঞ্চালকও।

যে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংবাদ ও টেলিভিশন সাংবাদিকতায় পুরুষদের প্রাধান্য ছিল, সেই সময়ে একজন নারীর এ ধরনের অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাউন্ট্রি বিশ্বাস করতেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের সামনে সরাসরি প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত। প্রস্তুত বক্তৃতার বাইরে তাঁদের প্রকৃত অবস্থান জানতে হবে।

এই বিশ্বাসই হয়ে ওঠে ‘মিট দ্য প্রেস’-এর সাংবাদিকতার ভিত্তি। অনুষ্ঠানে অতিথি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে বিশেষ ছাড় দেওয়া হবে না; এমন একটি নীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল এর শুরু থেকেই।

মার্থা রাউন্ট্রি ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠানটির সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার কাজ পরবর্তী প্রজন্মের নারী সাংবাদিকদের জন্যও পথ তৈরি করে।

শুধু সাক্ষাৎকার নয়, জবাবদিহির মঞ্চ

‘মিট দ্য প্রেস’ জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এর প্রশ্নোত্তরের ধরন। একজন রাজনীতিক কিংবা নীতিনির্ধারক কোনো বক্তব্য দিলেই সেটি বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করার পরিবর্তে সাংবাদিকেরা চাইতেন ব্যাখ্যা, যুক্তি ও তথ্য।

কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো? এর ফলে সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে? সরকারের আগের অবস্থানের সঙ্গে নতুন সিদ্ধান্তের বিরোধ কোথায়? জনস্বার্থের বিষয়ে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কত দূর?

এমন প্রশ্নই অনুষ্ঠানটিকে সাধারণ টেলিভিশন সাক্ষাৎকার থেকে আলাদা করে তোলে। প্রথম দিকে অনুষ্ঠানটি ছিল প্রায় ৩০ মিনিটের। একজন অতিথিকে ঘিরে প্রশ্ন করতেন একাধিক সাংবাদিক। পরবর্তী সময়ে এর সময়, সঞ্চালক এবং উপস্থাপনার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু মূল ধারণাটি টিকে গেছে: সংবাদ তৈরি করা মানুষের কাছে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন।

এ কারণেই ‘মিট দ্য প্রেস’ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, টেলিভিশনভিত্তিক রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি দীর্ঘস্থায়ী মডেল।

ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠা একটি অনুষ্ঠান

দীর্ঘ পথচলায় ‘মিট দ্য প্রেস’-এর অতিথি হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, বিশ্বনেতা, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা, নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

১৯৬০ সালের ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠানটিতে প্রথম অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। তখন দেশটিতে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হচ্ছে। অনুষ্ঠানে তিনি অহিংস আন্দোলন, নাগরিক অধিকার এবং মার্কিন সরকারের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে আরও চারবার তিনি এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

‘মিট দ্য প্রেস’-এর দীর্ঘ ইতিহাসের আরেক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় সাংবাদিক টিম রাসার্টের সময়কাল। ১৯৯১ সালে তিনি অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্ব নেন। কঠোর প্রস্তুতি, তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন এবং অতিথির আগের বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের তুলনা টানার জন্য তার বিশেষ পরিচিতি তৈরি হয়।

২০০৮ সালে তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত অনুষ্ঠানটি মার্কিন রাজনৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম প্রভাবশালী মঞ্চ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখে।

টেলিভিশন সাংবাদিকতার সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা

দীর্ঘ সময় ধরে সম্প্রচারের জন্য ‘মিট দ্য প্রেস’ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও স্থান পেয়েছে। ১৯৪৭ সালের ৬ নভেম্বর টেলিভিশনে যাত্রা শুরুর পর নানা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে অনুষ্ঠানটি। সাদাকালো সম্প্রচার থেকে রঙিন টেলিভিশন, অ্যানালগ প্রযুক্তি থেকে ডিজিটাল সম্প্রচার; প্রতিটি যুগের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

বদলেছে স্টুডিও। বদলেছেন উপস্থাপক। বদলেছে দর্শকের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস। কিন্তু বদলায়নি একটি মৌলিক বিষয়: গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রশ্নের মুখোমুখি করার প্রয়োজনীয়তা।

ডিজিটাল যুগেও প্রাসঙ্গিক কেন?

বর্তমানে ‘মিট দ্য প্রেস’-এর সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়েলকার। তিনি অনুষ্ঠানটির ১৩তম সঞ্চালক।

শুধু প্রচলিত টেলিভিশন সম্প্রচার নয়, এনবিসি নিউজের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনুষ্ঠানটির সাক্ষাৎকার ও বিশ্লেষণ পৌঁছে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে।

একসময় রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার দেখতে দর্শককে নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের সামনে বসতে হতো। এখন সেই সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

এই পরিবর্তন সাংবাদিকতার জন্য সুযোগ যেমন তৈরি করেছে, তেমনি এনেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। ছোট ভিডিও ক্লিপে অনেক সময় পুরো বক্তব্যের প্রেক্ষাপট হারিয়ে যায়। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় গভীর অনুসন্ধান ও পাল্টা প্রশ্নের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।

এমন বাস্তবতায় ‘মিট দ্য প্রেস’-এর ঐতিহ্য মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক সাক্ষাৎকারের মূল্য শুধু অতিথির পরিচিতি কিংবা বক্তব্যের উত্তেজনায় নয়। এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে প্রশ্নের মান, তথ্যের নির্ভুলতা এবং প্রয়োজনীয় পাল্টা প্রশ্নের ওপর।

বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার জন্য শিক্ষা

বাংলাদেশেও রাজনৈতিক টক শো, সাক্ষাৎকার ও সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠান এখন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এসব অনুষ্ঠানে সরকারের প্রতিনিধি, বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি কখনো কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ, দলীয় অবস্থানের পুনরাবৃত্তি কিংবা উচ্চকণ্ঠের প্রতিযোগিতাও দেখা যায়।

এই জায়গায় ‘মিট দ্য প্রেস’-এর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

একটি ভালো রাজনৈতিক সাক্ষাৎকারের উদ্দেশ্য শুধু অতিথিকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া নয়। বরং তার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা, সিদ্ধান্তের যুক্তি জানতে চাওয়া এবং সাধারণ মানুষের হয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলে ধরা।

একজন রাজনীতিকের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর যে প্রশ্নটি দর্শকের মনে থেকে যায়, সেটিই কখনো কখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতাগত প্রশ্ন। সঞ্চালকের কাজ সেই প্রশ্নটি করা।

একই সঙ্গে ‘মিট দ্য প্রেস’-এর ইতিহাস এটাও দেখায়, একটি অনুষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী হতে হলে শুধু পরিচিত মুখ বা আলোচিত অতিথির ওপর নির্ভর করলে চলে না। প্রয়োজন ধারাবাহিক বিশ্বাসযোগ্যতা, পেশাগত স্বাধীনতা, গবেষণাভিত্তিক প্রস্তুতি এবং দর্শকের কাছে জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি।

৭৯ বছর পরও যে প্রশ্নটি অমলিন

১৯৪৭ সালের সেই পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী এক নয়। তখন টেলিভিশন ছিল নতুন প্রযুক্তি। আজ মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন। তখন সংবাদ পৌঁছাতে সময় লাগত। এখন কয়েক সেকেন্ডেই কোনো বক্তব্য বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

তবু গণতন্ত্র, রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের অধিকার নিয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে। ক্ষমতাবানরা কেন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন? তাদের প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হলো? জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি কোথায়?

৭৯ বছর আগে ‘মিট দ্য প্রেস’ যে সাংবাদিকতার ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল, আজও তার প্রাসঙ্গিকতা কমেনি। বরং তথ্যের বিপুল প্রবাহ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ভুল তথ্যের এই যুগে নির্ভুল, স্বাধীন ও সাহসী প্রশ্ন করার প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

‘মিট দ্য প্রেস’-এর ৭৯ বছরের ইতিহাস তাই শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের দীর্ঘায়ুর গল্প নয়। এটি সেই সাংবাদিকতার গল্প, যেখানে ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন করার অধিকারই সবচেয়ে বড় শক্তি।

বিষয়:টেলিভিশন মার্থা রাউন্ট্রি মিট দ্য প্রেস রাজনীতিবিদ রেডিও সাংবাদিকতা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…