কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে প্রায় রুখে দিয়েছিল সুইজারল্যান্ড। ম্যাচের দশম মিনিটে আর্জেন্টিনা লিড নিলেও দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফেরে সুইশরা। সমতায় ফেরার পর সুইজারল্যান্ড পরিণত হয়েছিল দশজনের দলে। তারপরও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে লিওনেল মেসিদের রুখে দিয়েছিল। এরপর যোগকরা সময়ের প্রথমার্ধেও ছিল ১-১ সমতা। তবে দ্বিতীয়ার্ধে চিরচেনা ছন্দে ফেরে গতআসরের চ্যাম্পিয়নরা। আলভারেজের গোলে লিড নেয়ার পর মার্টিনেজের গোল, ৩-১ গোলে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটে লিওনেল স্কালোনি শিষ্যরা।
মিয়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, জুলিয়ান আলভারেজ ও লৌতারো মার্টিনেজ। আর সুইশদের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন ড্যান এনডয়ে। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ডের। আগামী ১৫ জুলাই বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় আটালান্টায় গড়াবে ফাইনালে ওঠার মহারণ।
ম্যাচের শুরুটা ইতিবাচক ছিল সুইজারল্যান্ডের। প্রথম তিন মিনিটে একাধিকবার আর্জেন্টিনার রক্ষণে হানা দিয়েছিল তারা। তবে জোরাল আক্রমণ সাজাতে পারেনি। ষষ্ঠ মিনিটে দারুণ দলীয় সমন্বয়ে আক্রমণ সাজায় সুইশরা। ডি-বক্সের ভেতরে ঢুকে শট নিতে ব্যর্থ হয়। পরে ডি বক্সের বাইরে থেকে নেয়া গ্রানিত জাকার শট উপর দিয়ে উড়ে যায়।
ম্যাচের নবম মিনিটে প্রথমবার আক্রমণে যায় আর্জেন্টিনা। গঞ্জালো মন্টিয়েলের দেয়া ক্রসে মাথা ছোঁয়াতে পারলেন না আর্জেন্টিনার কেউ। ফিরতি বল পেয়ে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে দেন লিওনেল মেসি। তবে ম্যাক অ্যালিস্টারের শট প্রতিপক্ষ ফুটবলারের গায়ে লেগে চলে যায় বাইরে। কর্নার পায় আর্জেন্টিনা। পরপর দুবার কর্নার পেয়ে দশম মিনিটে গোল আদায় করে আলবিসেলেস্তেরা। মেসির নেওয়া কর্নারে সবার চেয়ে ওপরে লাফিয়ে উঠে বল জালে জড়ান ম্যাক অ্যালিস্টার। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপে মেসির দশম অ্যাসিস্ট এটি, চলতি আসরে দ্বিতীয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনার সর্বোচ্চ ৮ অ্যাসিস্ট রেকর্ড মিশর ম্যাচেই ছাড়িয়ে যান মেসি। এবার নিজের রেকর্ডকেও আরও টেনে নিলেন।
৩১ মিনিটের মাথায় বড় সুযোগ তৈরি করেছিল সুইজারল্যান্ড। একা বল পেয়ে আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করেছিলেন ড্যান এনডয়ে। তবে এগিয়ে এসে স্লাইড করে বল ক্লিয়ার করে আর্জেন্টিনাকে গোলহজম থেকে বাঁচান এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। এরপর আরও কয়েকবার আক্রমণে যায় সুইশরা, তবে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। তাতে ১-০ গোলে এগিয়ে বিরতিতে যায় লিওনেল স্কালোনি শিষ্যরা।
বিরতির পর নেমে ম্যাচের ৫০ মিনিটে দারুণ একটি সুযোগ পেয়েছিল সুইজারল্যান্ড। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্তিনেজের দারুণ ডিফেন্ডিং এবং নিজেদের ফিনিশিং ব্যর্থতায় গোলটি পায়নি সুইসরা।
৫২ মিনিটে সুযোগ তৈরি করে জুলিয়ান আলভারেজ। তবে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের দূরপাল্লার শট সুইজারল্যান্ডের ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল চলে যায় বাইরে। কর্নার পেলেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ফের সুযোগ তৈরি করে সুইজারল্যান্ড। ড্যান এনডয়ের তৈরি করা আক্রমণে আলভারেজের ভুলে আবার ডি-বক্সে বল পায় সুইজারল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত লিয়ান্দ্রো পারেদেসের দারুণ চেষ্টায় বিপদমুক্ত হয়।
৬০ মিনিটে ফের আর্জেন্টিনা রক্ষণে হানা দেয় সুইজারল্যান্ড। তবে বাম পাশ থেকে রিকার্ডো রদ্রিগেজের ক্রসে করা ব্রিল এম্বোলোর হেড সহজেই গ্লাভসবন্দী করেন মার্টিনেজ। দুই মিনিট পর মাঝমাঠের কাছে ফাউলের শিকার হন নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। ফ্রি কিক পায় আর্জেন্টিনা। তবে লিওনেল মেসির শট ফিরিয়ে উল্টো আক্রমণে যায় সুইজারল্যান্ড। কর্নারের মধ্য দিয়ে সেটি ঠেকায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের ৬৫ মিনিটের মাথায় দারুণ গোছানো আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণের আবারও পরীক্ষা নেয় সুইজারল্যান্ড। প্রথমে ড্যান এনডয়ের চেষ্টা রুখে দেন মার্টিনেজ। পরে গ্রানিত জাকার দূরপাল্লার শট বাম দিকে ঝাঁপিয়ে আবারও নিজের জাল অক্ষত রাখেন আর্জেন্টিনা গোলরক্ষক।
একের এক আক্রমণে ৬৭ মিনিটে আর্জেন্টিনা রক্ষণভেদ করতে সক্ষম হয় সুইশরা। রিকার্ডো রদ্রিগেজের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া কবে ডি-বক্সে ঢুকে চমৎকার প্লেসিং শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন বানালেন ড্যান এনডয়ে। ১-১ সমতায় ফেরে সুইজারল্যান্ড।
৭২ মিনিটে দশজনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। ডাইভ দেওয়ার অপরাধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ব্রিল এম্বোলো। সাইডলাইনের কাছে বল ছিল এম্বোলো কাছে। লিয়ান্দ্রো পারেদেস সেটি কেড়ে নিতে গেলে পড়ে যান সুইশ তারকা। প্রথম দেখায় পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। তবে ভিএআর কক্ষ থেকে রেফারিকে বলা হয় ঘটনার পর্যালোচনা করতে। পরে মনিটরে গেলে দেখা যায়, মূলত ডাইভ দিয়েছেন এম্বোলো। তাই তাকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। এর আগে প্রথমার্ধে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেছিলেন এম্বোলো। দুই হলুদ কার্ডের কারণে লাল কার্ডে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে।
৮৫ মিনিটে বড় সুযোগ হাতছাড়া করেন মেসি। লিয়েন্দ্রো পারেদেসের চমৎকার পাসে ডি বক্সে বল পান মেসি। তবে বল ধরে ফিনিশিং ঠিকঠাক করতে পারলেন না মেসি। অবশ্য বল জালে পাঠালেও গোল বাতিল হতো। কারণ অফসাইডের ফাঁদে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
৮৯ মিনিটে বাম পাশ থেকে নিকোলাস গঞ্জালেসের দারুণ চেষ্টায় অনেকটা ফাঁকায় হেড করার সুযোগ পেয়েছিল ম্যাক অ্যালিস্টার। তবে তার হেড উড়ে যায় জালের ওপর দিয়ে। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে বাম পাশ থেকে ডান পা দিয়ে গোলের চেষ্টা করলেন লিওনেল মেসি। অল্পের জন্য বারের বাইরে দিয়ে চলে যায় বল। সুযোগ হাত ছাড়া হয় আলবিসেলেস্তেদের। এরপর যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের দুর্দান্ত শট ঠেকিয়ে দেন সুইজারল্যান্ড গোলরক্ষক। শেষ অবধি ১-১ সমতায় মূল সময় শেষ হয়ে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
বদলি নামার পর থেকেই নিজের ছাপ রাখার চেষ্টা করে চলেছেন থিয়াগো আলমাদা। ম্যাচের ৯৫ মিনিটে তার দূরপাল্লার শট অল্পের জন্য গোল হয়নি। ১০২ মিনিটের মাথায় ডি বক্সের বাইরে ফাউলের শিকার হন লিওনেল মেসি। ফ্রি কিক পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি মেসি। সুইজারল্যান্ডের রক্ষণ দেয়ালে প্রতিহত হয় তা। একের পর এক চেষ্টা করলেও গোলের দেখা না পাওয়ায় অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধও শেষ হয় ১-১ সমতায়।
অনবরত আক্রমণের পর অবশেষে ১১২ মিনিটে জালের ঠিকানা খুঁজে পায় আর্জেন্টিনা। ডি বক্সের বাইরে থেকে আলভারেজের দূরপাল্লার শট ফেরাতে পারেননি সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল। ২-১ গোলে এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা। চলতি বিশ্বকাপে আলভারেজের প্রথম গোল এটি। আর সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে পঞ্চম গোল।
নির্ধারিত ১২০ মিনিট শেষ হওয়ার পর যোগকরা সময় তৃতীয় গোলের দেখা পায় আর্জেন্টিনা। পাল্টা আক্রমণে উঠে প্রথমে শট নেন নিকোলাস গঞ্জালেস। ফিরতি বল ফাকায় বল পেয়ে চমৎকার ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়ালেন লৌতারো মার্টিনেজ। শেষ অবধি ৩-১ গোলে জিতে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।







