আত্মিক সমর্থন, মৌখিক স্বীকৃতি আর কার্যসিদ্ধকরণের সমন্বিত নাম ঈমান। সাতটি বিষয়ের প্রতি যথাযোগ্য গুরুত্বারোপ করা ঈমানের চাহিদা হলেও মূলে আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও পরম ভালোবাসা। এখানেই ঈমানের পূর্ণতা।
ঈমানের গ্রহণযোগ্যতা, নির্ভরতা এবং পূর্ণতার অমোঘ সূচিতে বিন্যস্ত হয়ে আছে দয়াল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রেমের টান। স্বয়ং মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কুরআনে বারংবার ইশারা ইঙ্গিতে নির্দেশনা দিয়েছেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মান্য করতে, আনুগত্য করতে সর্বোপরি সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে। খেয়াল রাখা জরুরি, মান্যকরণ কিংবা আনুগত্য তখনই হয়, যখন হৃদয়মূলে ভালোবাসা জন্ম নেয়।
পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে নবীপ্রেম রাখে মূখ্য ভূমিকা। এ ব্যাপারে একটি ঘটনা। বিশিষ্ট সাহাবিয়ে রসুল হযরত আবদুল্লাহ ইবন হিশাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমরা নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপবিষ্ট ছিলাম। এ সময় তিনি হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরেছিলেন। তখন হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, ওগো আল্লাহর রসুল! আমার প্রাণ ব্যতীত আপনি আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না; ঐ মহান সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! যতক্ষণ না আমি তোমার জানের চেয়েও প্রিয় না হব ততক্ষণ তোমার ঈমান পূর্ণ হবে না। উমর কিছুক্ষণ পর বললেন, আল্লাহর শপথ, এখন আপনি আমার কাছে আমার জানের চেয়েও বেশি প্রিয় হয়ে গেছেন। নবীজি বললেন, হাঁ, উমর! এখন তোমার ঈমান পূর্ণ হয়েছে। [সহিহ বুখারি শরিফ, খ.২, পৃ.৯৮১।]
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অগাধ ভালোবাসার মাঝেই নিহিত ইহপারলৌকিক সফলতা। একজন মানুষ ঈমান এনে মুমিন হয়, এটাই শর‘ঈ প্রক্রিয়া। মুমিন জীবনে সবচেয়ে বড় ভক্তি ও ভালোবাসা রাখতে হবে নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি। নবীপ্রেমের উৎকৃষ্ট উপমার স্বাক্ষর রেখেছেন সাহাবায়ে কিরাম। যেমন—প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত, এক ব্যক্তি রসুলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরজ করেন, হে আল্লাহর প্রিয় রসুল! কিয়ামত কবে হবে? নবীজি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?’’ উত্তরে লোকটি বললেন, তেমন কিছু না, তবে আমি আল্লাহ ও তার রসুলকে ভালবাসি। তিনি বললেন, তুমি যাকে ভালবাস, রোজ কিয়ামতের মাঠে তার সাথেই তুমি থাকবে।’’ অন্য বর্ণনায় আছে, আমি বেশি নামাজ-রোজা ও সাদকাহর মাধ্যমে প্রস্তুতি নিতে পরিনি। কিন্তু আমি আল্লাহ ও তার প্রিয় রসুলকে ভালবাসি। নবীজি বললেন, তুমি যাকে ভালবাস, তার সাথেই তুমি থাকবে। হযরত আনাস রা. বলেন, “যাকে ভালবাস, তার সাথেই তুমি থাকবে” নবীজির এ কথা শুনার পর ইসলামের আবির্ভাবের পর আমি মুসলমানদেরকে কোনো বিষয়ে এতো আনন্দিত হতো দেখিনি, যতটা আনন্দিত হয়েছেন তারা এ বাণীতে। [সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফ।]
ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহির মতে, রসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা ঈমানের অংশ। বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করে স্বীয়গ্রন্থ সহিহ বুখারি শরিফে অধ্যায় সাজিয়েছেন “বাবু হুব্বুর রসূলি মিনাল ঈমান” বলে। একইভাবে ঈমাম মুসলিম রহমাতুল্লাহি আলাইহিও সহিহ মুসলিম শরিফে অধ্যায় যোজন করে নবীপ্রেম ঈমানের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
ঈমানের নমুনা, পরিচয় ও পরিধি আমরা পেয়েছি একমাত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মারফত। এজন্য ঈমান পূর্ণতা পায় স্বয়ং তারই মাধ্যমে। থলেভর্তি মূল্যবান সম্পদ যেভাবে থলের তলা ব্যতীত সুরক্ষিত নয়, তেমনি মুমিনের ঈমানের যাবতীয় কার্যকারিতা রসুলল্লাহ’র ভালোবাসা ছাড়া অনিরাপদ, অগ্রহণযোগ্য। হাদিসে মুবারকায় অমীয় বাণীর অনুরণিত হয়েছে এভাবে যে, হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি ও সকল মানুষের চেয়ে প্রিয় না হব। [সহিহ বুখারি শরিফ, খ.১, পৃ.৭।]







