কঙ্গোর স্বাধীনতার নেতা ও দেশটির প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডের শেষ জীবিত সন্দেহভাজন এতিয়েন দাভিগনন মারা গেছেন। এর মধ্য দিয়ে বিশ শতকের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সাবেক বেলজিয়ান কূটনীতিক ও শিল্পপতি দাভিগননের বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। ‘জ্যাক ডেলরস ইনস্টিটিউট’ এর পর্ষদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। এছাড়া ইউরোপীয় কমিশনার ও বেলজিয়ামের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন দাভিগনন। প্রায় ৬৫ বছর আগে সংঘটিত প্যাট্রিস লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চলতি বছর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়।
অভিযোগ ছিল, কঙ্গোর নেতা লুমুম্বাকে বেআইনিভাবে আটক ও স্থানান্তরের ঘটনায় তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন এবং তাকে নিরপেক্ষ বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। লুমুম্বার দুই রাজনৈতিক সহযোগী মরিস ম্পোলো ও জোসেফ ওকিটোর হত্যাকাণ্ডেও দাভিগননের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তাকে বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশের বিরুদ্ধে করা আপিলের রায়ের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
১৯৬০ সালে বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন প্যাট্রিস লুমুম্বা। কিন্তু স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের মধ্যে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে তাকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, বেলজিয়াম ও পশ্চিমা শক্তির সমর্থনে পরিচালিত ষড়যন্ত্রের ফলেই লুমুম্বাকে উৎখাত ও হত্যা করা হয়েছিল। বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তাকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় এবং পুরো অভিযানটি বেলজিয়ান কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে মোবুতুর সামরিক অভ্যুত্থানে লুমুম্বাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পরে তাকে গৃহবন্দী করা হয়, নির্যাতন করা হয়, এবং ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি কাটাঙ্গার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে হত্যার জন্য হস্তান্তর করা হয়। সালফিউরিক অ্যাসিডে তার লাশ গলিয়ে ফেলা হয়, যাতে তার কোন সমাধি না থাকে।পরে বেলজিয়ান পুলিশ কমিশনার জেরার্ড সোয়েটের সাক্ষ্যে জানা যায়, হত্যার পর মরদেহ গোপনে সরিয়ে দূরবর্তী এক বনাঞ্চলে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল।
লুমুম্বার মৃত্যুর পর কঙ্গোতে শুরু হয় দীর্ঘ সেনাশাসন। লুমুম্বা হত্যাকাণ্ডকে আফ্রিকার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা এবং বেলজিয়ামের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্য সব অভিযুক্ত আগেই মারা গেছেন। ফলে দাভিগননই ছিলেন তদন্তাধীন শেষ জীবিত সন্দেহভাজন। আদালত জানিয়েছে, অন্য সন্দেহভাজনদের মৃত্যুর পর তাদের বিরুদ্ধে মামলা আর চালু থাকবে না।
তবে দাভিগননের মৃত্যুর পরও বিচারপ্রক্রিয়া থেমে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে লুমুম্বার পরিবার। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, মামলাটি বিচারের যোগ্য বলে কৌঁসুলী ও ট্রাইব্যুনাল যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, তা এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। পরিবারটির আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বেলজিয়াম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলাসহ আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কঙ্গোতে দায়িত্ব পালনের পর দাভিগনন বেলজিয়ামের প্রশাসন ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী পল হেনরি স্পাকের মন্ত্রিপরিষদ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় কমিশনার ছিলেন। এছাড়া দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।







