আমরা ঢুকে পড়েছি জনাব ফজলুল হক, সাগরের পিতার অফিস ঘরে। তিনি কিছু লিখছিলেন। না তাকিয়েই ঈশারা করলেন, বসো। সাগর ঈশারায় আমাকে বসতে বলে।
আমি একা বসে গেলাম। সাগর বসলো না। বসে না বলে একটু অস্বস্তি হয়। সেই কাল থেকে আমার সমস্যা হচ্ছে, যে মানুষকে বিশেষ মনে করি, তাঁর সামনে গেলে মনে কুণ্ঠা জেগে ওঠে, জড়তা এসে যায়। সেই বিকালে অনুভব করি, চেয়ারে বসে থাকা আমি মানুষটা যেনো কাঠের তৈরি।
অফিসঘরের দেয়ালে অনেকগুলো ‘সান অফ পাকিস্তান’ চলচ্চিত্রের স্থিরচিত্র। তখনো আমি জানি না, স্থিরচিত্রে যে ছোট্ট অভিনেতাকে দেখা যাচ্ছে সে অভিনেতার নাম সাগর, আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণটি, যে এখন আমার বন্ধু। যার পুরো নাম ফরিদুর রেজা সাগর।
আমার ডান দিকে, টেবিলের উপর কয়েকটি খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখা। সাগর সেসবের মাঝখান থেকে পূর্বদেশ পত্রিকাটা হাতে তুলে নেয়। হাতের কাজ শেষ হলো ফজলুল হক সাহেবের। মোটা ফ্রেমের চশমাটা একটু নাকের উপর চড়িয়ে দিয়ে আমাকে এক ঝলক দেখে তাকালেন পুত্রের দিকে।
তাকানো মাত্রই সাগর পরিচয় করিয়ে দেবার ঢঙে আমার নাম বলে, ও আফজাল। হাতের খবরের কাগজ উল্টে চাঁদের হাটের পাতা বের করে তার আব্বার সামনে রাখে। দেখেন, গল্প, কবিতা, ছড়ার ইলাস্ট্রেশনগুলো সবই আফজালের আঁকা। তারপর এক নিশ্বাসেই বলে ফেলে আমাকে তাঁর কাছে আনবার হেতু কী! আম্মার নতুন বইয়ের প্রচ্ছদ কি ওকে দিয়ে আঁকানো যায়?
যাঁকে প্রশ্ন করা তিনি মন দিয়ে চাঁদের হাঁটের পাতায় কিছু একটা পড়ছেন। নিচু করে রাখা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছি, মন দিয়ে তিনি আমার কোন ইলাস্ট্রেশন দেখছেন না। সাগরও তা বুঝতে পারে। সাগরের চিন্তিত হওয়ার অভিব্যক্তি কেমন আমার জানা নেই বলে বুঝতে পারি না, কী মনে করছে সে।
কিছুটা সময় নৈশব্দে কাটে। একসময় চাঁদের হাটের পাতা থেকে মুখ তুলে তাকান তিনি। মোটা ফ্রেমের চশমাটা খুলে রাখেন টেবিলে তারপর ছেলেকে বলেন, আমি তো কাইয়ূম চৌধুরীর সাথে কথা বলে ফেলেছি। শুনে আমাদের মনে হতাশা নেমে আসে। আমার আশা তো শেষ হয়েই গিয়েছিল। সাগরেরটা অনুমান করে বললাম।
আশা শেষ হয়ে যাওয়ায় ভাবছি, গতকাল থেকে মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সাগর যখন ঠিক করেছে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে প্রচ্ছদ বিষয়ে কথা বলবে, নিশ্চয়ই মনে বিশ্বাস রাখে, পিতা প্রস্তাব উড়িয়ে দেবেন না। আমি আশা করেছি, বিশ্বাস করেছিলাম, জীবনের প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকার সুযোগ মিলে যাবে।
মনের বহু রকমের ভাবনা লাফায় ঝাঁপায়, ডিগবাজি দেয়, শুয়ে বসে থাকে। মনই মনকে বলে, বেশি আশা করলে এমনই হয়। অত বেশি আশা করা তোমার মোটেও উচিত হয়নি আফজাল হোসেন।
এইসব ভাবছি। চোখ কেবল তাকিয়ে ছিল। অনেক সময় চোখ তাকিয়েই থাকে কেবল, দেখে না কিছুই। একেই বোধহয় বলে, ঘোরে থাকা। সামনের মানুষটার কণ্ঠস্বরে ঘোর কাটে, আফজাল তোমার ইলাস্ট্রেশন খুব ভালো। একবার মাত্র শুনেছেন আমার নামটা। শুনেছেন কি শোনেনি সেটা বুঝতে পারিনি। নাম উচ্চারণ করলেন তাতে শুনেছেন, বুঝতে পারলাম।
নাম জিনিসটায় জাদু আছে। পরিচিত নয় কিংবা সদ্য পরিচিত এমন কেউ নিজের নাম ধরে ডাকলে, সুখানুভূতি হয়। মনে বিষন্নতা ছড়িয়েছিল তার উপর ভালোলাগার রং ছড়িয়ে পড়ে। ভালো লাগে, প্রচ্ছদ আঁকতে পারার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে যাক, আমার আঁকা ইলাস্ট্রেশানের প্রশংসা করলেন সৃজনশীল একজন মানুষ।
এ এক অসাধারণ প্রাপ্তি। আমার মন আমাকেই স্বান্তনা দেয়, অনেক আশা করা দোষের নয় যুবক। মন বহুকিছু চায়, চাওয়া মনের স্বভাব; দোষ নেই তাতেও। আশা করা বা যা যা চায় মন সবকিছু পেতেই হবে, তা কেনো? জীবন দিবা-রাত্রির, সুখ অসুখের, প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তিরও। আশা করে পাওয়া হয় না, সে না পাওয়ার অভিজ্ঞতাও নিশ্চয় জীবনে প্রয়োজনীয়।
প্রচ্ছদ আঁকতে পারার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে তার দুঃখ অনেকটাই কমে যায় ইলাস্ট্রেশনের প্রশংসায়।
বেল বাজান তিনি। একজন দরজা খুলে ভিতরে আসে। খুবই হাল্কা পাতলা দেখতে। তাকে আমাদের জন্য চা আনবার আদেশ করেন। দুই কাপ চায়ের সাথে বিস্কুটও এলো। নাও বলে আর এক দফা প্রশংসা করলেন আমার হাতের লেখার। সাগর সেই প্রশংসা শুনে বোধহয় মনে জোর পায়। বলে, ও প্রচ্ছদও খুব ভালো করবে।
সেই কথার পর মনে হলো দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িরা একত্রে তাদের আওয়াজ বাড়িয়ে দিয়েছে। আসলে তা নয়। ঘরটা খানিকক্ষণ কথাহীন থাকে বলে মনে হয়, ঘড়িদের শব্দ বেড়ে গেছে।
চায়ে চুমুক দিয়ে দিয়ে চা শেষ করা যাচ্ছে না। মনে হতে থাকে থেমে আছে। সাগর চা খায় না। তার কাছে ঘরের সে পরিবেশ বোধহয় বেশি ভারীবোধ হচ্ছিল। সে পিতার উদ্দেশ্যে বলে, কাইয়ূম চৌধুরী স্যারকে যদি বলেই থাকো, ফোন করে জেনে নেয়া যায়, কতদিনে তিনি প্রচ্ছদটা এঁকে দিতে পারবেন!
পুত্রের বলা কথা শেষ হওয়া মাত্রই ফোনটা কাছে টেনে নিয়ে পিতা ফোনের ডায়াল ঘোরান। দেশের সবচেয়ে নামী প্রচ্ছদশিল্পীকে ফোনে পাওয়া গেলো। চোখের সামনে অসাধারণ একটা ঘটনা ঘটে। প্রচ্ছদ পেতে দেরি হবে শুনে মনখারাপ করলেন না। জানালেন, ঠিক আছে আমি অন্য ব্যবস্থা করে নিচ্ছি।
ফোন রেখে মিটমিট করে হাসেন তিনি। বললেন, কাইয়ূম ব্যস্ত কারো ছড়ার বই নিয়ে। অনেকগুলো ইলাস্ট্রেশন করতে হচ্ছে। বুঝি অনেক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। দেশের অনেক অনেক লেখক প্রকাশকেরা চায় কাইয়ূম চৌধুরীর এঁকে দেয়া প্রচ্ছদ নিয়ে বই বের হবে।
একটা নোটপ্যাড টেনে নিয়ে তিনি খসখস করে কিছু লিখলেন। লেখা শেষ করে কাগজটা বাড়িয়ে দেন আমার দিকে, আগামীকালের মধ্যে অন্ততপক্ষে চার রকম স্টাইলে উপন্যাস ও লেখকের নাম লিখে নিয়ে আসবে। ক্যালিওগ্রাফি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তা দিয়ে ভালো কভার ডিজাইন হতে পারে। নাও।
আমি কাগজটা হাতে নেই। সেটায় বড় করে লেখা ‘ফেরারী সূর্য’, তার নিচে একটু ছোট হরফে রাবেয়া খাতুন।
হঠাৎ হৈহৈ করে নেমে পড়া বৃষ্টি যেমন অপ্রস্তুত মানুষদের ভিজিয়ে দেয়, তেমনি প্রচ্ছদ করতে পারার সুযোগ না মিলতে মিলতে মিলে গেছে, সে অপার আনন্দে মন ভিজে গেছে আমার। আনন্দের মধ্যে শীত শীত ভাবও থাকে। অনুভব করি সে শীতের কাঁপন।
আনন্দে সিক্ত, কম্পমান মনে আচমকা দমকা হাওয়ার মতো এসে হাজির হয়ে যায় একটি বিস্ময়। ‘ফেরারী সূর্য’র নিচে লেখা রাবেয়া খাতুন। প্রশ্ন জাগে, বিখ্যাত রাবেয়া খাতুন কি সাগরের মা?







