বিশিষ্ট নির্মাতা আলী আহমাদজাদেহর বাড়িতে এক চাঞ্চল্যকর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় ইরানের স্বাধীন চলচ্চিত্র জগত আবারও টালমাটাল! কোনো বিচারিক আদেশ ছাড়াই প্রায় পঞ্চাশজন সশস্ত্র ব্যক্তি নির্মাতার বাড়িতে ঢুকে তাকে অস্ত্রের মুখে হুমকি দেয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে মুখ খুলেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতা ও রাজনৈতিক দমননীতি-বিরোধী কণ্ঠস্বর জাফর পানাহি এবং মোহাম্মদ রাসুলফ।
ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, ২৬ জুলাই চলচ্চিত্র নির্মাতা আহমাদজাদেহর বাড়িতে একদল সশস্ত্র এজেন্ট হামলা চালায়। তবে দেশটির বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা কী অভিযোগে এই অভিযান, তা জানায়নি।
আলী আহমাদজাদেহকে ইরানে পরিচিত ভিন্নমতাবলম্বী ও আন্দোলনপন্থী চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে। তিনি বহুবার সরকারবিরোধী প্রতিবাদে সমর্থন জানিয়েছেন এবং তার নির্মিত কিছু চলচ্চিত্রে হিজাববিরোধী অবস্থান স্পষ্ট, যা তাকে সরকারের টার্গেটে পরিণত করেছে। তার অধিকাংশ কাজই তৈরি হয়েছে সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়াই।

এর আগেও ২০২২ সালে তেহরানে সরকারি অনুমতি ছাড়া সিনেমা বানানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এই নির্মাতা। তার নির্মিত ‘ক্রিটিকাল জোন’ ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার (গোল্ডেন লেপার্ড) অর্জন করে। একই ছবি ৪১তম হাইফা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও দেখানো হয়।
স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতার ঘরে এমন অভিযানে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন সম্প্রতি কানজয়ী ইরানের কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা জাফর পানাহি। সোমবার (২৮ জুলাই) নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি লিখেছেন, “এই হামলা কেবল একজন নির্মাতার উপর নয়- এটি স্বাধীন সিনেমার উপর, ক্যামেরার ওপর, গল্পের ওপর, সৃষ্টিশীলতার নিঃশ্বাসের ওপর আঘাত।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এটা কোনো ডাকাতি নয়, এটা ছিল এক প্রকার মানসিক সন্ত্রাস, যার উদ্দেশ্য ছিল মনোবল চূর্ণ করা, আশা ধ্বংস করা, আর ক্যামেরা স্তব্ধ করে দেওয়া।”
View this post on Instagram
পোস্টের সঙ্গে পানাহি শেয়ার করেছেন আলী আহমাদজাদেহর বিধ্বস্ত ঘরের একটি ভিডিও, যেখানে দেখা যায় এলোমেলো করে দেওয়া আসবাবপত্র, খালি হয়ে যাওয়া তাক, ভাঙচুরের চিহ্ন— যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র! জানা গেছে, ওই হামলায় আহমাদজাদেহর ক্যামেরা, ল্যাপটপ, সাইনবোর্ড এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে বন্দুকের মুখে বলা হয় “আগামীকাল গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ে চলে এসো।”
পানাহি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “এটা কোনো সরকার নয়— এটা হলো সরকার-পরিচালিত সন্ত্রাসবাদ।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যখন সরকারের প্রেসিডেন্ট ক্যামেরার সামনে বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপের কথা বলেন, আর সংস্কৃতি মন্ত্রী নির্বাসিত শিল্পীদের ফেরানোর স্বপ্ন দেখেন— তখন দেশে ফিরলে তাদের এমন অপহরণই কি অপেক্ষা করছে?”
এই ঘটনার মাধ্যমে ইরানে স্বাধীন মত প্রকাশ ও শিল্পচর্চার বর্তমান পরিস্থিতি আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। পানাহি পোস্টের শেষ অংশে বলেন, “আজ যদি আমরা চুপ থাকি— তাহলে আগামীকাল এই সন্ত্রাসের শিকার হবেন আরও অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা, এমনকি তারাও, যারা সরকারি লাইসেন্স নিয়ে তথাকথিত ‘স্বাধীন সিনেমা’ বানান।”
শুধু পানাহি নন, এ ঘটনায় জোর প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইরানের আরেক বিখ্যাত নির্মাতা মোহাম্মদ রাসুলফ। তিনি বলেন,“এই অবৈধ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নির্মাতাদের কারাবন্দি করতে পারে, তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিতে পারে কিন্তু সৃষ্টিশীলতাকে আটকে রাখতে পারবে না। ইরানি নির্মাতারা তাদের সিনেমা বানানো চালিয়ে যাবেন।”
ইরানি আইন অনুযায়ী, যেকোনো চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুমতি নিতে হয় এবং তা প্রদর্শনের জন্যও আলাদা করে অনুমোদন নিতে হয়। এই নিয়মনীতির মাধ্যমে সরকার দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
আর এই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন জাফর পানাহি। আর নিজের এই সোচ্চার ভূমিকার কারণে যিনি গ্রেপ্তারও হয়েছেন। ২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবে পানাহির ছবি ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান এক্সিডেন্ট’ এর জন্য পাম দ’ওর পুরস্কার পান। তিনি বহু বছর ধরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার ও নজর বন্দিত্বের মধ্যেও গোপনে চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ রাসুলফকে ২০২৪ সালে ইরান সরকার ৮ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। –ইরান ইন্টারন্যাশনাল









