যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সৃষ্ট ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইরান। এমন সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বুধবার ১৫ এপ্রিল তথ্যটি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
তেহরান বলছে, মার্কিন ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ দাবিতে তারা অটল রয়েছে, যদিও আঞ্চলিক শক্তিগুলো সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের প্রতিনিধি জানান, পাঁচটি আঞ্চলিক দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর হামলা চালানো হয়েছে এবং এসব দেশকেও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ইরান ‘হরমুজ প্রণালী প্রোটোকল’-এর মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি প্রস্তাবও দিয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কর আরোপের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। রাশিয়ার সংবাদ সংস্থা আরআইএ নভোস্তি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকে দেশটি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনায় ক্ষতিপূরণের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় এটি অগ্রাধিকার পাবে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সামরিক স্থাপনা ছাড়াও তেল-গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। এছাড়া সেতু, বন্দর, রেল নেটওয়ার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি শোধনাগারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু হাসপাতাল, স্কুল ও সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িও ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা-র কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বেসামরিক নাগরিকদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের সামর্থ্য নেই বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র মোহাজেরানি। ইরানি বিমান সংস্থা সমিতির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৬০টি বেসামরিক বিমান অচল হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে ২০টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৬০টি যাত্রীবাহী বিমান চালু থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো এবং যুক্তরাষ্ট্র-এর নিষেধাজ্ঞার কারণে রক্ষণাবেক্ষণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া, ৪০ দিনের সংঘাতে বিমান খাতের ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ ট্রিলিয়ন রিয়াল (প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ডলার)। তেহরান, তাবরিজ, উরমিয়া এবং খোররামাবাদসহ বিভিন্ন শহরের বিমানবন্দর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব ক্ষতির পরও পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বড় কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। এদিকে, ইরানের কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই বলেছেন, ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বাড়ানো উচিত নয়। তার মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পুনরায় হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (সিপরি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরান সামরিক খাতে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এবং পরবর্তীতে সেই বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনাও করেছে। দেশজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার কারণে ইরানের অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে। ৯ কোটির বেশি মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইরান চেম্বার অফ কমার্স।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের ক্ষতি, নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে ইরানের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, যদিও কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।







