যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে ইরান। ফলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে বহুদিনব্যাপী আলোচনার উদ্যোগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে এমন অবস্থান জানালো তেহরান।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ১৩ এপ্রিল থেকে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং সম্প্রতি একটি ইরানি কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করা যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে আগ্রাসন চালালে ইরান যথাযথ জবাব দেবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইসলামাবাদে প্রথম দফা আলোচনার আগে দেওয়া তেহরানের ১০ দফা প্রস্তাবই ভবিষ্যৎ যেকোনো আলোচনার ভিত্তি হিসেবে বহাল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে না, এর ফল কখনোই ভালো হবে না, বলেন বাঘাই। তিনি জানান, এসব লঙ্ঘনের বিষয়টি পাকিস্তানকে অবহিত করা হয়েছে, যারা দুই পক্ষের প্রধান মধ্যস্থতাকারী।
অন্যদিকে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, তারা এখনও দুই পক্ষকে আলোচনায় ফেরাতে সক্ষম হবেন বলে আশা করছেন। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনা আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছিল, যার লক্ষ্য ছিল চলমান সংঘাতের অবসান।
তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনা আলোচনার সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিয়েছে বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথম দফার আলোচনার মতো একদিনের পরিবর্তে এবার কয়েকদিনব্যাপী বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল, যেখানে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। এতে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির জন্য ৬০ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়া যেত।
কিন্তু গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তেজনা দ্রুত বাড়ায় ইরান আলোচনায় অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রোববার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তার প্রতিনিধিরা পাকিস্তানে আলোচনার জন্য যাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলার আগের হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানগুলো একটি ফরাসি ও একটি ব্রিটিশ জাহাজসহ বিভিন্ন জাহাজে গুলি চালিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
তিনি লিখেছেন, আমরা একটি ন্যায্য চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছি। তারা গ্রহণ না করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেবে।
উত্তেজনা আরও বাড়ে সোমবার ভোরে, যখন ট্রাম্প জানান, ইউএসএস স্প্রুয়ান্স নামের একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ওমান উপসাগরে একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ আটক করেছে। সতর্কবার্তা অমান্য করায় জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে হামলা চালিয়ে সেটিকে থামানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। পরে মার্কিন মেরিন সদস্যরা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই ঘটনাকে দস্যুতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ইরান।
এদিকে সম্ভাব্য আলোচনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়। শহরের ইসলামাবাদ ম্যারিয়ট হোটেল ও সেরেনা হোটেল ইসলামাবাদ অতিথিদের রোববারের মধ্যে কক্ষ ছাড়ার নির্দেশ দেয় এবং নতুন বুকিং বন্ধ করে দেয়।
রাজধানীর সুরক্ষিত ‘রেড জোন’ এলাকায় সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখানে জাতীয় পরিষদ, বিদেশি দূতাবাসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, রাস্তাজুড়ে বসানো হয় কাঁটাতারের ব্যারিকেড।
তবে সর্বশেষ উত্তেজনার আগেই আলোচনায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় ছিল। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, হরমুজে অবরোধ, নতুন হামলার হুমকি এবং অযৌক্তিক দাবি শান্তির প্রচেষ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যতক্ষণ নৌ অবরোধ থাকবে, ততক্ষণ উত্তেজনাও বজায় থাকবে।








