জাপান সরকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তিবাদী সংবিধান থেকে সরে এসে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর নিজেদের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি-এর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত নেয়, যা দেশটির প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তাকাইচি জানান, নতুন নীতির আওতায় কোন কোন অস্ত্র রপ্তানি করা হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে জাপানের গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ এসবই এখন রপ্তানির আওতায় আসতে পারে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার জন্য এসব যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে জাপান সম্মত হয়েছে।
তাকাইচি বলেন, এই সংশোধনের ফলে নীতিগতভাবে সব ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম স্থানান্তর সম্ভব হবে। তবে তিনি যোগ করেন, এসব অস্ত্র কেবল সেই দেশগুলোকেই দেওয়া হবে, যারা জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবহার করার অঙ্গীকার করবে।
তিনি আরও বলেন, ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠা বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশে এখন কোনো একক দেশের পক্ষে নিজস্ব শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জাপানের চুনিচি শিম্বুন পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, অন্তত ১৭টি দেশ জাপানে তৈরি অস্ত্র কেনার যোগ্যতা পাবে। ভবিষ্যতে আরও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হলে এই তালিকা বাড়তে পারে।
এর আগে ১৯৬৭ সালে প্রণীত এবং ১৯৭৬ সালে কার্যকর হওয়া নীতিমালায় জাপানের সামরিক রপ্তানি কেবল অপ্রাণঘাতী সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ ছিল যেমন নজরদারি ও মাইন অপসারণে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি। আসাহি শিম্বুন জানিয়েছে, নতুন নীতির পরও চলমান সংঘাতপূর্ণ দেশগুলোতে অস্ত্র রপ্তানিতে বিধিনিষেধ থাকবে, তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম করা হতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জাপানের তৈরি অস্ত্র কিনতে আগ্রহী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
এই নীতিগত পরিবর্তনের পরপরই জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে ৭০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি সই হয়েছে, যার আওতায় মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্য ১১টি যুদ্ধজাহাজের মধ্যে প্রথম তিনটি নির্মাণ করবে।
ইয়াসুকুনি মন্দির ইস্যুতে বিতর্ক
এদিকে, একই দিনে তাকাইচি টোকিওর বিতর্কিত ইয়াসুকুনি শ্রাইন-এ বসন্ত উৎসব উপলক্ষে একটি ধর্মীয় নিবেদন পাঠিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
উনিশ শতকে নির্মিত এই মন্দিরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দণ্ডিত এক হাজারের বেশি জাপানি যুদ্ধাপরাধীর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাদের মধ্যে ১৪ জন “ক্লাস এ” অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ছিলেন। এ কারণে জাপানি কর্মকর্তাদের এই মন্দির পরিদর্শন দীর্ঘদিন ধরে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও অন্যান্য দেশের কাছে সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলাসহ অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর জাপান নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে, যেখানে যুদ্ধ থেকে সরে থাকার অঙ্গীকার করা হয়।
তবে চীনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত তাকাইচি যাকে অনেক সময় জাপানের “আয়রন লেডি” বলা হয় সাম্প্রতিক নেতাদের মধ্যে অন্যতম, যিনি দেশটির শান্তিবাদী অবস্থান থেকে সরে আসার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
চীনের প্রতিক্রিয়া
এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় চীন তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে এবং জাপানের বেপরোয়া নতুন সামরিকীকরণকে দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করবে।








