দুরন্তপনা শৈশবের প্রতিনিধিত্ব করা সিনেমার নাম ‘আম কাঁঠালের ছুটি’। মোহাম্মদ নূরুজ্জামান পরিচালিত সিনেমাটি গেল বছর সীমিত সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। খুব বেশী আলোচিত হয়েছে এমনটা নয়, তবে যারাই সিনেমাটি দেখেছেন; হয়েছেন স্মৃতিকাতর। করেছেন ভূয়সী প্রশংসা।
সিনেমাটি দেশে বিদেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয়েছে। ছবিটি নিয়ে নতুন করে আলোচনার কারণ, মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার ২০২৩! আসছে মে মাসে দেয়া হবে এই পুরস্কার। যেখানে তিনটি বিভাগে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমাটি। সেরা নির্মাতা, সেরা চলচ্চিত্র এবং সেরা অভিনেতা- এই বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটলো ‘সেরা অভিনেতা’র মনোনয়ন নিয়ে!
‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমায় প্রধান চরিত্র বলতে মইন্না চরিত্রটি। গ্রামের ডানপিটে এক বালক! বয়স ১১ কিংবা ১২! সিনেমায় এই চরিত্রটি দর্শক হৃদয় স্পর্শ করে গেছে। এমন কোনো দর্শক নেই, যারা মইন্নার মধ্যে নিজের শৈশবকে খোঁজে পাননি!
মইন্না সিনেমার চরিত্র, বাস্তবে তিনি লিয়ন আহমেদ। পেশাদার কোনো অভিনয়শিল্পী নন। থাকতেন টঙ্গীর এক ঘুপচিতে। ২০১৭ সালের একেবারে শুরুর দিকে সিনেমাটির দৃশ্য ধারণ শেষ করেন নির্মাতা। করোনার শুরুর দিকেও যোগাযোগ ছিলো তার সাথে। কিন্তু তার কিছুদিন পর থেকেই লাপাত্তা হন মইন্না ওরফে লিয়ন।

২০২০ সালের পর থেকে টঙ্গীতে আর কেউ দেখেনি লিয়নদকে। প্রায় চার বছর ধরে সে কোথায় আছে, কেমন আছে; জানে না কেউ। ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমাটি যখন বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে ডাক পাচ্ছিলো, তখন থেকেই লিয়নের খোঁজ করছিলেন নির্মাতা নূরুজ্জামান। কিন্তু কোথাও তার হদিস পাওয়া যাচ্ছিলো না।
লিয়নকে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমায় যুক্ত করেছিলেন ‘আদিম’ খ্যাত নির্মাতা যুবরাজ শামীম। সেই যুবরাজও লিয়নের ঠিকুজি জানার চেষ্টা করেছেন। লিয়নের কাছের বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে তার পরিবারের সাথে টঙ্গীতে যাদের সখ্যতা ছিলো; তাদের কাছেও খোঁজ করেছেন। কিন্তু পাওয়া যায়নি লিয়নকে।
পরে দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির প্রাক্কালে আরো এক দফায় খোঁজা হলো লিয়নকে। এরমধ্যে গেল বছর শিল্পকলায় হলো সিনেমাটির বিশেষ শো। যেখানে চলচ্চিত্রাঙ্গন ও সংবাদমাধ্যমের বহু মানুষজন সিনেমাটি দেখে প্রধান চরিত্র মইন্না ওরফে লিয়নকে খোঁজ করছিলেন। কারণ সিনেমায় তার অভিনয় ছিলো অনবদ্য!
সেই অনবদ্য অভিনয়ের কল্যাণে আরো একবার প্রসঙ্গ হলেন লিয়ন। ‘আম কাঁঠালের ছুটি’র জন্য মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার ২০২৩- এ চলচ্চিত্র ও ওয়েব ফিল্ম বিভাগে ‘সেরা অভিনেতা’ হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন মইন্না ওরফে লিয়ন। এই বিভাগে লিয়নকে ছাড়াও দুজন গুণী অভিনেতা পেয়েছেন চূড়ান্ত মনোনয়ন। একজন ‘ফ্রাইডে’ ওয়েব ফিল্মের জন্য নাসির উদ্দিন খান, এবং অন্যজন ‘বাবা, সামওয়ান’স ফলোয়িং মি’র জন্য শহীদুজ্জামান সেলিম। বিষয়টি নাড়া দেয় স্বয়ং নির্মাতাকে! এমন গর্বিত মুহূর্তেটিতে যে করেই হোক সিনেমার সেই মইন্নাকে পাশে চান নির্মাতা!
শেষবারের মতো লিয়নকে খোঁজে পাওয়ার মিশনে নামেন মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। এবার পাওয়া যায় তাকে। যদিও তাকে খোঁজে বের করার গল্পটিও যথেষ্ট নাটকীয়তায় ঠাঁসা। প্রথমে বিস্তারিত জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন নির্মাতা এবং এই ছবি সংশ্লিষ্ট আরো কয়েকজন। পরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ছাপা হয়। এরমধ্যে বুধবার (২৪ এপ্রিল) নির্মাতা যুবরাজ শামীমের ফেসবুকে ভিন্ন নামের এক আইডি থেকে যোগাযোগ করেন মইন্না! হাফ ছেড়ে বাঁচেন সবাই।

বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে মইন্নার সাথে গাজীপুরের বোর্ডবাজার সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন নির্মাতা নূরুজ্জামান ও যুবরাজ শামীম। মুঠোফোনহীন লিয়নকে দেয়া হয় একটি স্মার্ট ফোন। যেন আবার যোগাযোগের গভীর সমস্যা তৈরী না হয়। সেই সাথে ‘সেরা অভিনেতা’ হিসেবে মইন্না চরিত্রটির চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রাপ্তির সংবাদ ছাপা হওয়া পত্রিকাটিও লিয়নের জন্য বয়ে নেন নির্মাতা নূরুজ্জামান। যে মুহূর্তটিকে ভীষণ আনন্দ আর তৃপ্তির বলেও এসময় মন্তব্য করেন নূরুজ্জামান ও যুবরাজ।
এসময় লিয়ন কথা বলেন চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে। জানান, করোনার সময় জীবিকার তাগিদে টঙ্গী ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে গিয়েছিলেন। পরে থিতু হন গাজীপুরের বোর্ডবাজারে। বর্তমানে সেখানে তিনি রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন। তাকে খোঁজ করার বিষয়টি পরিচিত একজনের মারফত জানতে পারেন। পরে যুবরাজ শামীমকে ফেসবুকে নিজের অস্তিত্ব জানান দেন লিয়ন!
মে মাসে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে লিয়ন উপস্থিত থাকবেন ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ টিমের সাথে।








