গত দুই পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম বন্ধ্যাত্বের কারণ এবং রোগ নির্ণয় পদ্ধতি নিয়ে। আজকের শেষ পর্বে থাকছে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগ এবং আধুনিক বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত।
বন্ধ্যাত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগ। যখন জরায়ুর অভ্যন্তরীণ ঝিল্লি বা এন্ডোমেট্রিয়ামের অনুরূপ কোষ কলা, জরায়ুর বাইরে পাওয়া যায় এবং বৃদ্ধি পায়। প্রতি মাসে মাসিকের সময় যেমন জরায়ুর অভ্যন্তরীণ থেকে রক্তস্রাব হয়, তেমন এন্ডোমেট্রিওসিস থেকেও রক্তপাত হয়। মেয়েটি বলে যে, তার মাসিকের আগে খুব ব্যথা হয়, মাসিক শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যথা যায় না। ব্যথা হবে বিধায় সে দুই দিন আগে থেকেই ব্যথার ওষুধ খাওয়া শুরু করে। আমাদের লক্ষ্য থাকে মেয়েটির এন্ডোমেট্রিওসিস আছে কিনা সেটা ডায়াগনোসিস করা। টিভিএস পদ্ধতির মাধ্যমে ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। এন্ডোমেট্রিওসিস ডায়াগনোসিস এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে, ধরে নিই বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার একটি ধাপ অতিক্রম করলাম।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৪০-৫০ শতাংশ এন্ডোমেট্রিওসিস পেশেন্ট বা রোগীদের মধ্যে বন্ধ্যাত্ব পাওয়া যায়। এই রোগে তলপেটের অঙ্গসমূহের স্বাভাবিক পারস্পরিক বিন্যাস নষ্ট হয়ে যায়। এন্ডোমেট্রিওসিস ডিম্বাশয়কে আক্রান্ত করে চকলেট সিস্ট তৈরি করে। এই রোগের উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিকের সময় প্রচণ্ড ব্যথা, সহবাসকালীন ব্যথা।
চিকিৎসা পদ্ধতির বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের ল্যাপারোস্কপি, হিস্টেরোস্কপি ডায়াগনোসিস এবং অপারেটিভ কারণে করা লাগতে পারে। ল্যাপারোস্কপি এক ধরনের আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি যা দ্বারা পেট না কেটে, পেটে ছিদ্র করে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে পেটের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রত্যক্ষ করে রোগ নির্ণয় ও অপারেশন করা হয়। ল্যাপারোস্কপির মতো হিস্টেরোস্কপি আরেকটি বিশেষ অস্ত্রোপচার পদ্ধতি যেখানে চিকন সরু ক্যামেরা যোনিপথে প্রবেশ করিয়ে জরায়ুর ভিতরের অবস্থা ভালোভাবে দেখা ও প্রয়োজনে অপারেশন করা যায়।
যদি একটি টিউব খোলা থাকে অথবা শুক্রকীটের নড়াচড়া, সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু কম থাকে তাহলে Intrauterine insemination (আইইউআই) পদ্ধতিতে গর্ভধারণ করানোর চেষ্টা করা হয়। আইইউআই পদ্ধতিতে সহবাস ছাড়া স্বামীর বীর্যকে সেন্ট্রিফিউজ মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে অধিকতর চলমান শুক্রকীট স্ত্রীর ডিম ফোটার সময় সরু ক্যাথেটারের মাধ্যমে জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়।
আইভিএফ বা টেস্টটিউব চিকিৎসা একটি আধুনিক এবং বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি। যেখানে মানুষের শরীরের বাইরে ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রুণ তৈরি করা হয় এবং ভ্রুণটি জরায়ুতে সরু ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করা হয়। সাধারণত মহিলাদের দুটি টিউবই বন্ধ থাকলে বা প্রকট আকারের এন্ডোমেট্রিওসিস (স্টেজ ৪) স্বামীর স্পার্ম সংখ্যায় অনেক বেশি কম থাকলে আইভিএফ বা টেস্টটিউব পদ্ধতিতে যেতে হয়। অ্যাজোস্পার্মিয়া অর্থাৎ বীর্যে কোনো শুক্রকীট না থাকে সেক্ষেত্রে এপিডিডাইমিস (বীর্যবাহী নালী) অথবা অণ্ডকোষ থেকে সিরিঞ্জের মাধ্যমে কিছু টিস্যু নিয়ে ল্যাবরেটরিতে মাইক্রোস্কোপের সহযোগিতায় দেখা হয় শুক্রকীট আছে কিনা। থাকলে সেটা দিয়ে আইসিএসআই (ইক্সি) পদ্ধতিতে টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ-এ যাওয়া যায়। ইক্সি পদ্ধতিতে ইনভার্টেড মাইক্রোস্কোপের সহযোগিতায় একটি ডিম্বাণুর ভেতরে নিডেল দিয়ে একটি শুক্রাণু প্রবেশ করিয়ে ফার্টিলাইজেশন (নিষিক্তকরণ) করা হয়।
আপনারা জানেন যে, সরকার, জনগণ এবং চিকিৎসকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় আমূল পরিবর্তন এসেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ইনফার্টিলিটি বিষয়ে একটি সাবজেক্ট ওপেন করা হয়েছে এবং প্রতি বছর বেশ কিছু বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসক বের হচ্ছেন। যদিও এ চিকিৎসা বহু বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে, বর্তমানে সেটি ব্যাপ্তি লাভ করেছে।
সর্বোপরি, একজন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি বলতে চাই যে, দেশেই যেহেতু বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসার সুব্যবস্থা রয়েছে, কালক্ষেপণ না করে প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার সাথে ধৈর্য ধরে চিকিৎসা নিয়ে সাফল্যের পথে এগিয়ে চলুন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







